টিকিটের জন্য হাহাকার

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৫
আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-আজহা ও দুর্গাপূজাকে ঘিরে দূরপাল্লার সব গণপরিবহনের টিকিটের হাহাকার চলছে। গতকাল শুক্রবার তৃতীয় দিনের মতো রেলওয়ের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা ছিল খুবই সামান্য। এ কারণে কমলাপুরে হাজির হওয়া টিকিট প্রত্যাশীদের অধিকাংশই ফিরে গেছেন মন খারাপ করে। সদরঘাট নদীবন্দর ও আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোর কথা বলাই বাহুল্য। কোথাও কোনো টিকিট নেই। শুক্রবার দুপুরে গাবতলী টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, দূরপাল্লার সড়ক পরিবহনগুলোর কাউন্টারে ধর্ণা দিচ্ছেন বহু মানুষ। কিন্তু টিকিট মিলছে না। ঈদের আগের অন্তত ১০ দিনের কোনো টিকিট নেই বলে সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন কাউন্টার কর্মীরা। দক্ষিণাঞ্চলে নৌপথের যাত্রীদের অনেকেই লঞ্চ-কেবিনের অগ্রিম টিকিটের জন্য জড়ো হচ্ছেন সদরঘাটে। কিন্তু বরাবরের মতোই কেবিনের কোনো অগ্রিম টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ঘরমুখো মানুষের একমাত্র ভরসা লঞ্চের ডেক। আর ডেকের টিকিট অগ্রিম বিক্রি হয় না, ভ্রমণের দিন লঞ্চে উঠার সময় সংগ্রহ করার নিয়ম। গাবতলী বাস টার্মিনালে টিকিটের খোঁজে আসা যুবক আলামিন হোসেনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ঝিনাইদহের মহেশপুর যাওয়ার জন্য ১৩ তারিখ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে যে কোনো দিনের টিকিট সংগ্রহের উদ্দেশে এসেছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিত বেতনের এই চাকুরে। কিন্তু ঘন্টা দুয়েক ঘুরেও কোনো লাভ হয়নি। তিনি বলেন, কল্যাণপুর থেকে গাবতলী টার্মিনাল পর্যন্ত যতগুলো কাউন্টার থেকে ওই অঞ্চলের গাড়ি ছেড়ে যায়, তার সবগুলোতেই খোঁজ নিয়েছি। কোথাও টিকিট নেই। স্ত্রী এবং দুই বছর বয়সী ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে কিভাবে ঈদ করতে যাবো বুঝতে পারছি না। টিকিটের এমন হাহাকারের বিষয়ে জানতে চাইলে গাবতলী কেন্দি ক দূরপাল্লার পরিবহন ‘মেহেরপুর ডিলাক্সের’ কর্ণধার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এমনিতেই প্রত্যেক ঈদ মৌসুমে চাহিদার বিপরীতে যোগান কম থাকায় ঘরমুখো মানুষ টিকিটের জন্য বিড়ম্বনায় পড়েন। তার ওপর এবার ঈদ এবং দুর্গাপূজা খুব কাছাকাছি সময়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে বিধায় পরিবহনের টিকিট সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্গাপূজার মূল পর্ব শুরু হচ্ছে ১০ অক্টোবর এবং প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্জা শেষ হবে ১৪ তারিখে। এরপর মাত্র একদিনের ব্যবধানেই ১৬ অক্টোবর পবিত্র ঈদ-উল-আজহা উদযাপিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুসলমান ও হিন্দুদের বড় দুটি ধর্মীয় উত্সব কাছাকাছি সময়ে হওয়ার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ একযোগে গ্রামের দিকে ছুটবেন। স্বাভাবিকভাবেই সবধরনের পরিবহনে যাত্রীর চাপ তথা টিকিটের চাহিদা খুবই অস্বাভাবিক হবে। শুক্রবার বিকালে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো স্টেশনজুড়ে মানুষ আর মানুষ। কাউন্টারগুলোতে ঈদ মৌসুমের অগ্রিম টিকিটের জন্য ধর্ণা দিচ্ছেন অনেকেই। কিন্তু কোনো কাউন্টারেই অগ্রিম টিকিট নেই। গতকালের জন্য নির্ধারিত সব টিকিট শেষ হয়ে গেছে বেলা সাড়ে ১২টার মধ্যেই। তবে বিভিন্ন কাউন্টার থেকে নিয়মিত ট্রেনের টিকিট বিক্রি হচ্ছিল। ঈদের অগ্রিম টিকিট কাউন্টারে না মিললেও বাইরে চড়া দামে কালোবাজারিদের কাছে পাওয়া যায় অভিযোগ করেন কেউ কেউ। অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। কমলাপুরে কর্তব্যরত রেলওয়ের স্টেশন ব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার বলেন, টিকিটের কালোবাজারি রোধ এবং টিকিট সংগ্রহ করতে আসা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিআরপি পুলিশের ৬০ জন সদস্য ছাড়াও র্যাব-পুলিশের অর্ধশতাধিক সদস্য কমলাপুর স্টেশনে নিয়োজিত রয়েছেন। সে কারণে স্টেশনে কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য নেই বলে দাবি করেন তিনি। রেলওয়ের অন্য একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে রেলওয়ের দেয়া অগ্রিম টিকিটের যাত্রীরা ভ্রমণ শুরু করবেন ১১ অক্টোবর থেকে। গত বুধবার যারা টিকিট সংগ্রহ করেছেন, তারা ভ্রমণ করতে পারবেন ১১ তারিখে। আগামীকাল রবিবার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হবে। এদিন যারা টিকিট সংগ্রহ করবেন, তারা ভ্রমণ করতে পারবেন ১৫ অক্টোবর। শারদীয় দুর্গাপূজার কারণে ইতিমধ্যেই রেলওয়ের যাত্রীর চাপ অনেক বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের পুরোটা জুড়েই যাত্রীর অস্বাভাবিক চাপ থাকবে বলে তিনি জানান। লম্বা সময় ধরে ট্রেনে যাত্রীর চাপ সামলানোর প্রস্তুতি স্বচক্ষে দেখতে রেলমন্ত্রী মুজিবুল গত বৃহস্পতিবার কমলাপুর স্টেশন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি জানান, যাত্রীর চাপ বেশি হলেও সব ট্রেন সময়মতো ছেড়ে যাবে। মন্ত্রী বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রেলওয়ের বহরে নতুন ৩২টি ইঞ্জিন যুক্ত হয়েছে। বাড়ছে কোচের সংখ্যাও। কোচ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা বহরে যোগ হবে। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন যে, রোজার ঈদে শিডিউল রক্ষা করে চলতে পারেনি ট্রেন। তিনি বলেন, রেলওয়ের সম্পদ সীমিত। এ দিয়েই যতদূর সম্ভব সেবা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সামর্থ্যের পুরোটা যাতে সদ্ব্যবহার করা যায় সেটা নিশ্চিত করার জন্য রেল কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।