যে কোন পণ্য বাজারজাতকরণে বিশ্বময় আজ বিজ্ঞাপন জরুরি। আর বিজ্ঞাপনের জন্য দরকার মডেল। এই পারস্পরিক প্রয়োজন মেটাতে দেশের তরুণরাই বিজ্ঞাপনচিত্র নির্ভর ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্বনন্দিত মডেল বিবি রাসেল। বিবি মনে করেন পেশাদারি মনোভাব দিয়ে তরুরাই এ শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবে, পারবে এগিয়ে নিতে।
বাস্তব অবস্থাও তেমনটাই ইঙ্গিত করে। বিজ্ঞাপনচিত্রকে নির্ভর করে আজ দেশে গড়ে ওঠা শিল্পের পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন শাখা যেমন ফ্যাশন ফটোগ্রাফি, বিজ্ঞাপন নির্মাণ, এবং মডেলিংকে গ্রহণ করছে অসংখ্য তরুণ-তরুণী। প্রতিদিন নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে এসব পেশায়।
এ দেশের মডেলিংকে জনপ্রিয় করার পেছনে যাদের বিশেষ ভূমিকা আছে, নোবেল তাদের অন্যতম। দেশের শীর্ষস্থানীয় এই মডেল বলেন, গুটি কয়েকজন নিয়ে শুরু করা তাদের ছোট্ট ইন্ডাস্ট্রি এখন অনেক বিস্তৃত হয়েছে। অনেক কাজ হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা শেখার সুযোগ পাচ্ছে।
নোবেলের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা চলে ফটোশুট। ছবি যাচ্ছে ফ্যাশন হাউজে, পত্রিকায় আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের কাছে। মডেলদের ছবি তোলা নিয়ে শহরের ফ্যাশন ফটোগ্রাফাররা সকাল-বিকাল ব্যস্ত সময় কাটান। থাকে পত্রিকার প্রচ্ছদের ছবি তোলার কাজ।
ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে উঠছে কতশত বিজ্ঞাপন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন গভীর রাত অবধি চলে বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের কাজ।
পেশাদার মডেল হওয়ার বাসনা নিয়ে ফ্যাশন ফটোগ্রাফারের কাছে এক সময় এসেছিলেন আসেন এই সময়ের তরুণ মডেল শাহরিয়ার নেওয়াজ জনি। জনি জানান, তিনি তখন রাজশাহীতে থাকতেন। বন্ধুরাই তার ছবি একটি প্রতিযোগিতায় পাঠায় এবং তাদের আশাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে জনির ছবি সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়। এভবেই শুরু। সেটা ২০০৯ সালের কথা। জনি বলেন, ‘মডেলিং এর প্রথম ধাপ ফটোশুট করতে আমি ঢাকায় আসি। ফ্যাশন হাউজ থেকে ডাক আসে। তারপর র্যাম্পে ও ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। তারপর পণ্যের মডেল হয়ে নির্মাতাদের কাছে।’
এখন জনি র্যাম্প, ফ্যাশন হাউজ ও পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করে মডেলিংকে পুরোদস্তুর পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভালো একজন ফটোগ্রাফার আমাদের অনেক এগিয়ে নিয়ে যায়।’ এ প্রসঙ্গে ১৫ বছর ধরে ফ্যাশন ফটোগ্রাফির সাথে জড়িত সাফাওয়াত খান সাফু বলেন, ‘যেহেতু আমাদের এখানে তেমন করে মডেলিংভিত্তিক কোন ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেনি তাই একজন মডেল আমাদের কাছে এলে আমরা তাদের গাইড-এর দায়িত্ব পালন করি। তার হাঁটা-চলা ঠিক করা এবং তার খুঁতগুলো ধরিয়ে দিয়ে তা সারিয়ে উঠতে সাহায্য করি। কারণ তাদের জন্যই আমি শতভাগ পেশাদার ফ্যাশন ফটোগ্রাফার। মডেলিংকে ভিত্তি করে আমরা প্রায় ২৫-৩০ জন পেশাদার ফ্যাশন ফটোগ্রাফার কাজ করছি।’
আমাদের দেশে মডেলিং পেশার প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে সাফু বলেন, ‘ইনস্টিটিউট না থাকা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।’ আমাদের মডেলদের মান সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিবছর লাক্সসহ বেশকিছু ব্র্যান্ড ভাল প্লাটফর্ম দেয়। ব্যক্তি বিশেষ ভাল কাজ করে দেশের বাইরে (ভারতে) কাজ করার সুযোগও পান।
অগ্রসরমান মডেলিং ক্যারিয়ারের চাহিদা মেটাতে গুটিকয়েক ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটি চালান বুলবুল টুম্পা। টুম্পা নিজে ১৫ বছর মডেলিং করেছেন। অভিজ্ঞতা আছে ভারতের বিখ্যাত মডেলদের সাথে কাজ করার। তিনি বলেন, ‘আমাদের মডেলিং জগত্ এত বেশি দ্রুত বড় হচ্ছে যে কাজের জন্য চর্চার যথাযথ সময় পান না মডেলরা। তারপরও তারা দেশের বাইরে থেকে ক্রাউন পরে আসে, দেশের বাইরে মডেলিং করে—তা আমাদের জন্য গর্বের।’ টুম্পা আরও বলেন, ‘মানুষ ভাবে মডেলিং খুব সহজ একটি কাজ— শুধু দেখতে ভাল ও ফিগার ভাল থাকলেই হয়। কিন্তু কার্যত তা নয়, কারণ আমরা দেখেছি অনেক সুদর্শন ও সুন্দরী এ জগতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
অনেক বছর ফ্যাশন ফটোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত চঞ্চল মাহমুদ বলেন, ‘সব ক্ষেত্রের মতো এই ক্ষেত্রেও পড়াশোনার বিকল্প নেই। আমি শুরুর দিকের একজন পেশাদার মানুষ হিসেবে বলতে চাই, ভাল কাজের জন্য দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। ভাল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলে শিক্ষিত হতে হবে, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হতে হবে, বিনয়ী হতে হবে। মানুষের সাথে যত যোগাযোগ হবে তত দ্রুত পেশায় সফল হওয়া যাবে। ’
বিজ্ঞাপন নির্মাতা মুস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, এখন অনেক চ্যানেল, অসংখ্য পত্রিকা আর অনেক ফ্যাশন হাউজ। প্রতি বছর কত বিজ্ঞাপন নির্মাণ হয়, কত টাকা ব্যয় হয়, কত মানুষ এ কাজে জড়িত—তা হিসাব করলেই বোঝা যাবে আমাদের মডেলিং ইন্ডাস্ট্রির ক্রমবর্ধমান অবস্থা। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধকতা যা আছে তা নিয়েই আমরা সামনের দিকে এগুচ্ছি। বিজ্ঞাপন তার রঙ-রূপ পরিবর্তন করে নতুন অবস্থান তৈরি করছে। সে অবস্থান থেকে আরও এগি যাবে।
এই এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরও সুগম করতে দেশে একটি ফিল্ম ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন ফারুকী। তিনি বলেন, ফিল্ম ইনস্টিটিউট হলে আমরা টেকনিশিয়ান, ক্যামেরা পারসনসহ শিল্পী পাবো। যারা দক্ষ হয়ে আমাদের মডেলিং জগেক সমৃদ্ধ করবেন।
আর মডেল নোবেল মনে করেন, দেশের বড় অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মগুলো মডেলদের সাথে চুক্তিভিত্তিক কাজ করলে মানসম্পন্ন কাজ ও মডেল দুই-ই বাড়বে। চুক্তি অনুযায়ী, তারা সারা বছর মডেলকে বিভিন্ন কোম্পানির কাজ করাবে আর মডেলও যে কাজ পাবেন তাও তাদের ফার্ম থেকে করা হবে। ফলে পেশাগত নিরাপত্তা তৈরি হবে।
বিবি রাসেল বলেন, ‘মডেলিং অনেক কঠিন অভিনয়। বিখ্যাত মডেলরা নিজের মাধ্যম ঠিক করে কাজ করেন। আমি নিজেও যখন মডেলিং করেছি তখন অন্য কাজ করিনি। আমাদের এই জগত্ অনেক বিস্তৃত হয়েছে, অনেক কাজের জায়গা তৈরি হয়েছে। এখন স্থায়ীভাবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির সময় হয়েছে।’
