জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদন ভিত্তিহীন

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৬
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা এর সুবিধা পাচ্ছে না বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাকে মনগড়া ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট (বিসিসিটি)। গত বৃহস্পতিবার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে টিআইবি জানায়, রাজনৈতিক প্রভাবে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এনজিও নির্বাচন, প্রকল্প তৈরিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত না করা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে যথোপযুক্ত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারায় এ উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। টিআইবির প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা দিয়ে গতকাল শুক্রবার বিসিসিটি বলেছে, ভিত্তিহীন, মনগড়া ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। বিদেশি অর্থে গঠিত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রিজিলিয়েন্স ফান্ড (বিসিসিআরএফ)-এর মাধ্যমে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা কোন টাকা ব্যয় করে না। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের মতই একটি বরাদ্দ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ। কাজেই কোনো প্রকল্পে যদি সরকারের ক্রয় নীতি অনুসরণ করা না হয় তার জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় কিংবা ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট দায়ী নয়। তবু ক্রয়ের সকল ক্ষেত্রে সরকারি নীতি মেনে চলা হয়েছে। ১১ জন মন্ত্রীসহ অনেকে এই তহবিল পরিচালনার সদস্য। তাদের সকলের মিলিত সিদ্ধান্তেই সকল কাজ হয়ে থাকে। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু তহবিলের অর্থ সুষম বণ্টন হচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসাবে বিবেচিত সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনায় সবচেয়ে কম অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা যেমন টাঙ্গাইল, রাজশাহী, গাইবান্ধায় অনেক প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী অর্থাত্ স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। ফলে কার্যক্রমের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা যায়নি। টিআইবি জানায়, জলবায়ু প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছে এমন ৫৫টি এনজিওর কার্যক্রম নিয়ে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। এর মধ্যে ১০টি এনজিওর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৩টি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী এবং পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ৯টি প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি নিবন্ধন বাতিল করেছে এমন এনজিওকেও জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মাত্র ১৭টি প্রতিষ্ঠান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ৫৩টি এনজিওকে নির্বাচন করা হলে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে আবারো মূল্যায়ন করে ৬৩টি এনজিওকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্প নির্ধারণের ক্ষেত্রে ত্রুটি রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু তহবিলের অর্থ সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে। যা প্রায় ৩১.৯২ ভাগ। এছাড়া বন মন্ত্রণালয় পেয়েছে ১১.৫৫ ভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পেয়েছে ১২.৭৩ ভাগ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জলবায়ু ক্ষতিকারক দেশগুলো এমনিতেই অর্থ দিতে গড়িমসি করছে। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিবছর এক বিলিয়ন ডলার অনুদানের বিপরীতে গেল বছর অর্থ পাওয়া গেছে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলার। এ অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা আগামীতে প্রতিশ্রুত অনুদান না দিতে অজুহাত তৈরি করার ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ জলবায়ু তহবিলে অর্থ অনুদান দেয়া দেশগুলোর কাছে ‘ভুল ইঙ্গিত’ দেবে। কারণ বাংলাদেশের যে অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার সেই অঞ্চলেই সরকার এ ধরনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র করছে। ফলে প্রাপ্য অর্থ দিতে দেশগুলো গড়িমসি দেখাবে। যা আমাদের ক্ষতির কারণ হবে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টের বক্তব্য জলবায়ু তহবিল নিয়ে টিআইবির দেয়া প্রতিবেদন প্রসঙ্গে ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট বলেছে, বস্তুত জলবায়ু তহবিল বলতে কোনো তহবিলের অস্তিত্বই নেই। জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। মূলত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রিজিলিয়েন্স ফান্ড নামে দুটি ভিন্ন উত্স থেকে অর্থায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করা হচ্ছে। প্রথমটির উত্স সরকারের রাজস্ব, দ্বিতীয়টির উত্স দাতা সংস্থার অর্থায়ন (বিশ্বব্যাংক দ্বিতীয় অংশটি পরিচালনা করে । ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড থেকে এনজিওগুলোর জন্য পিকেএসএফকে মাত্র ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে; যা সমস্ত বরাদ্দের মাত্র ২ শতাংশ। এই দুই শতাংশ অর্থ ব্যয় নিয়ে গবেষণার নামে টিআইবি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা আজ থেকে ৬ মাস আগে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি মনগড়া প্রতিবেদনের অনুরূপ। বলা চলে কোথাও কোথাও ভাষার আংশিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস। বিশ্বব্যাংক যে অংশটি পরিচালনা করে তা নিয়ে টিআইবির কোনো বক্তব্য নেই। টিআইবির রিপোর্টে উল্লেখিত বাংলাদেশকে এক বছরে বিদেশ থেকে এক বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতির কথা হাস্যকর বলে মন্তব্য করা হয় ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টের বক্তব্যে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট দাবি করে, প্রকৃতপক্ষে দাতা সংস্থাগুলো গত ৩ বছরে সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ করেছে ৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। যার মধ্যে বাংলাদেশ একক দেশ হিসেবে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট আরো বলেছে, টিআইবির রিপোর্টে এনজিওসমূহকে বরাদ্দ দেয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট বলছে, জলবায়ু তহবিলের অর্থ বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত। জলবায়ু তহবিল বরাদ্দ একটি সুদীর্ঘ ও সুশৃংখল প্রক্রিয়া। এনজিওকে বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্টতা এড়ানোর জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় গত ২ বছর আগেই পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর উপর প্রকল্প বাছাই ও অর্থ বরাদ্দ প্রক্রিয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। কাজেই এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন অবান্তর। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টি বোর্ড এ বরাদ্দ প্রদানের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হলেও কারিগরি কমিটি ও পিকেএসএফ যাচাই-বাছাইয়ের পরই তা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করা হয়। যেহেতু বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ পিকেএসএফের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়; সেহেতু এখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নই আসে না। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট বলছে, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলে বরাদ্দের যে হার উল্লেখ করা হয়েছে তা বস্তুনিষ্ঠ নয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি হচ্ছে চট্টগ্রাম বিভাগে। জাতীয় সংসদে পাস করা আইন দ্বারা পরিচালিত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টি বোর্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকারের সিনিয়র ১১ জন মন্ত্রী, কয়েকজন সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি এই বোর্ডের সদস্য। এখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রতিটি প্রকল্প বিভিন্ন ধাপে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে একক কোন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা ব্যক্তির কর্তৃত্ব নেই। আবার প্রতিটি বৈঠকের সিদ্ধান্ত সভার পরপরই প্রেস বিজ্ঞপ্তি অথবা প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে দেশবাসীকে অবহিত করা হয়। ফলে প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তা ঠিক নয়। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। এ রকম মনগড়া রিপোর্ট সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে পেছনের দিকে টেনে ধরার অপপ্রয়াস কিনা সে প্রশ্ন থেকে যাবে। অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৬৩টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ১৩টি প্রকল্পের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে টিআইবি। অথচ রিপোর্টে সেটাকেই বড় করে দেখানো হয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ যেখানে রাজনীতির সাথে যুক্ত, সেখানে বরাদ্দ পাওয়া কোনো এনজি’র এক্সিকিউটিভ কিংবা কর্তা ব্যক্তিরা রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলে উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারবে না ? ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট তাদের বক্তব্যে বলে, সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা, বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ এবং তহবিল পরিচালনা প্রক্রিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াকে সফল দেশ হিসেবে অভিহিত করে লিফলেট বের করে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের ১৯৪টি দেশের ডেলিগেটদের কাছে বিতরণ করেছে। এছাড়া গত ৮ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাংক এক বিবৃতিতে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভালভাবেই অগ্রসর হচ্ছে।