বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ের কপি ফাঁসের ঘটনায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই কর্মচারী নয়ন আলী ও ফারুককে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাদের গ্রেফতার করে। আটক দুইজনসহ মোট তিন জনের বিরুদ্ধে একই দিন তথ্য প্রযুক্তি আইনে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা করেছে পুলিশ। ডিবির ইন্সপেক্টর ফজলুর রহমান বাদি হয়ে আইনের ৫৪, ৫৭ ও ৬৩ ধারায় মামলাটি করেন। মামলার অপর আসামি হলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইন-জীবী ব্যারিস্টার একেএম ফখরুল ইসলামের সহকারী মেহেদী হাসান। তবে তিনি পলাতক রয়েছেন। মামলায় ওই তিনজনের নাম উল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাত আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুলের ৬১ পাইওনিয়ার রোড, কাকরাইল কার্যালয়ে গতকাল দুপুরে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। প্রায় দেড় ঘণ্টা তল্লাশীর পর পুলিশ সেখান থেকে একটি মনিটর, দু’টি সিপিইউ, একটি প্রিন্টার ও অর্ধশত সিডি জব্দ করে। তবে পুলিশ ব্যারিস্টার ফখরুলের কক্ষ থেকে কিছু নেয়নি। অভিযানের পর ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি চেম্বারে ছিলাম না। তবে চেম্বারের লোকজন আমাকে জানিয়েছে, দুপুর আড়াইটার দিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শ’ খানেক লোক এসে আমাদের লোকজনকে ঘিরে ফেলে এবং তল্লাসী করে। আমার চেম্বার কক্ষটি তালাবন্ধ ছিল। অভিযানের কথা শুনে আমি চাবি পাঠিয়ে দিলেও তার আগেই পুলিশ দরজা ভেঙে আমার ঘরে ঢোকে। চেম্বার থেকে পুলিশ একটি মনিটর, দু’টি সিপিইউ, একটি প্রিন্টার এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায়ের সার্টিফাইড কপির একটি ফটোকপি নিয়ে গেছে। পরে বেলা ৪টার দিকে ডিবি পুলিশ চলে যায়।’
ট্রাইব্যুনালের দুই কর্মচারী গ্রেফতার, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীর চেম্বারে তল্লাশীর ঘটনা নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের সহকারী মেহেদী হাসানের সঙ্গে আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল ট্রাইব্যুনালের কর্মচারী ফারুকের। আর এই ফারুকের মাধ্যমেই নয়ন আলীর সঙ্গে মেহেদী হাসানের পরিচয় হয়। নয়ন আলী অস্থায়ী ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনি কম্পিউটারে কম্পোজের কাজও জানতেন। ফলে ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার অপারেটররা না থাকলে বিভিন্ন সময় নয়ন আলীকে দিয়ে কম্পোজ করানো হতো। এই সুবাদে কম্পিউটার রুমে নয়ন আলীর অবাধ বিচরণ ছিল। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিচারকরা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায় লেখা শুরু করেন। তখন থেকেই মেদেহী হাসান এই রায় নিয়ে কিছু তথ্য চান নয়ন আলীর কাছে। ট্রাইব্যুনালের অপর কর্মচারী ফারুক এই তথ্য দিতে নয়নকে উদ্বুদ্ধ করেন। এর পর থেকে নয়ন আলী কিছু কিছু করে রায়ের তথ্য পেনড্রাইভে করে মেহেদীকে দিতে থাকেন। সর্বশেষ রায় ঘোষণার দুই দিন আগেও কিছু তথ্য দিয়েছেন। ওই দিন কাকরাইলে ব্যারিস্টার ফখরুলের চেম্বারের কম্পিউটারে যখন তথ্য পেনড্রাইভ থেকে নামিয়ে দেন তখন নয়ন আলী বুঝতে পারেন এটি রায়ের কপি। তখন তিনি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে মেহেদী নয়ন আলীকে ভয় দেখালে তিনি কপি দিয়ে দেন, তা ছিল ১৬৫ পৃষ্ঠার। এরপর যে ৭ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে তা আর নয়ন আলী দেননি।
মনিরুল ইসলাম জানান, আপাতত ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার ও ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের চেম্বারের দু’টি কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছে। নয়ন ও ফারুককে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নয়ন আলী এসব তথ্য স্বীকার করেছেন। মেহেদীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানান। ডিবির উপ-কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় এবং মাসুদুর রহমান সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায়ের দিন তিনি ও তার পরিবার অভিযোগ তোলেন, ওই রায়ের কপি আগের দিনই একটি ওয়েবসাইটে পেয়েছেন তারা। এরপর ট্রাইব্যুনালের রেজিস্টার নাসির উদ্দিন মাহমুদ বুধবার রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি জিডি করেন। জিডির পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, রায় ঘোষণার কয়েকদিন আগে ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকেই খসড়া পর্যায়ে তা ফাঁস হয়ে থাকতে পারে। ওই জিডির তদন্ত করতে গিয়েই পুলিশ গতকাল দুই জনকে গ্রেফতার করেছে।
বিএনপির নিন্দা
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীর কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে দুটি কম্পিউটার ও মূল্যবান নথিপত্র আটকের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে আইনের শাসন এতটাই ভুলুণ্ঠিত হয়েছে যে, মানুষের সর্বশেষ আশ্রয় আদালত থেকে প্রতিকার পাবার অধিকারটুকুও আজ হারিয়ে গেছে। তিনি এই ঘটনাকে দুরভিসন্ধিমূলক ও অন্ধ হিংসার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন।
