অনিয়মই যেখানে নিয়মে পরিণত হইয়াছে!

আপডেট : ১৮ মে ২০১৯, ২১:৫৭

দেশের সর্বত্র অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করিবার আত্মঘাতী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে। যাহা নিয়ম তাহাকে উল্টাইয়া দেওয়া হইতেছে। ক্ষমতার সহিত সামান্য মাত্র সংযোগ রহিয়াছে এমন ব্যক্তিরাও দিনকে রাত আর রাতকে দিন করিয়া ছাড়িতেছেন। শুধু সাধারণ জনগণই নহে, বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানও তাহাদের হাতে জিম্মি হইয়া পড়িতেছে। সম্প্রতি এমনই ঘটনা ঘটিয়াছে পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের অবৈধ স্থাপনায় থাকা গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির সংযোগ নিজ নিজ সংস্থা কর্তৃক বিচ্ছিন্ন করিবার ও সব ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশনা প্রদান করে। এই নির্দেশনা দেওয়া হয় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চট্টগ্রামকে। এই মর্মে আরও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, দুর্যোগের সময় কোনো প্রাণহানি ঘটিলে জেলা প্রশাসক নিজেই বাদী হইয়া ওই সকল সংস্থার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করিবে। সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় জনস্বার্থকে সামনে রাখিয়া, জনগণের জানমালের যেন ক্ষতি না হয় সেই উদ্দেশে; কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হইলেও এই চারটি সংস্থা তাহাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করিতে পারে নাই। ১৫ মে নির্ধারিত সময় পার হইলেও সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয় নাই। অবশ্য সংস্থাগুলো বলিতেছে তাহারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অভিযান পরিচালনা করিতেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পিডিবি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গেলে বাধার সম্মুখীন হয়। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সড়ক অবরোধ, মামলা ও মিছিলও হয়। এমতাবস্থায় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা নিয়া প্রশ্ন উঠিতেছে। তাহারা স্থানীয় দুর্বৃত্তদের সহিত কোনো ক্রমেই পারিয়া উঠিতেছে না। যাহা জনস্বার্থে সাধিত হওয়া আবশ্যকীয় তাহা কী করিয়া এই দুর্বৃত্তদের বাধায় সম্পন্ন হইতে পারিতেছে না? চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রায়ই মানুষ হতাহত হয়। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এবারও তাহার আশঙ্কা রহিয়াছে। এই কারণে এই উচ্ছেদ অভিযান প্রেরণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের যথাসম্ভব পুনর্বাসনের উদ্যোগ আমাদের অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে।

সূত্রমতে, ঝুঁকিপূর্ণ মতিঝরনা পাহাড়ে উচ্ছেদে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা একত্রে মিলিয়া বাধা প্রদান করে। অন্য সকল বিষয়ে তাহারা নিজেরা বিভক্ত থাকিলেও অনিয়ম আর দুর্বৃত্তায়নে আসিয়া একজোট হইয়াছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। যেন যে কোনো প্রকারে হউক, পাহাড়ে মৃত্যুর ফাঁদ টিকাইয়া রাখিতে হইবে। এখানে কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর হইতে হইবে, সকল বাধা অতিক্রম করিয়া ও অসাধু চক্রকে পরাস্ত করিয়া উচ্ছেদ অভিযানকে সফল করিতে হইবে। না হইলে পাহাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকিয়াই যাইবে। এইক্ষেত্রে অনেকটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন জেলা প্রশাসনের ছয়জন ম্যাজিস্ট্রেট। তাহারা কিছুটা হইলেও সফল হইয়াছেন এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে। তাহাদেরকে এইজন্য সাধুবাদ জানাইতেই হয়; কিন্তু অন্যান্য সংস্থার কার্যক্রম দৃশ্যমান নহে। আমরা আশা করি, জেলা প্রশাসনের ন্যায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চট্টগ্রামও তাহাদের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিতে সক্ষম হইবেন। তাহাদের কেহ এই অনিয়মের সহিত জড়িত থাকিলে এবং তাহারা কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিলে তাহারও প্রতিবিধান করিতে হইবে।  ইহাতে যাহা নিয়ম তাহার প্রবর্তন ঘটিবে, অনিয়ম দূর হইবে, পাহাড় ধসে মৃত্যুর আশঙ্কা হ্রাস পাইবে। সর্বোপরি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হইবে। এভাবে বৃহত্ অনিয়মের মোকাবিলায় আমাদের সাফল্য লাভ করিতে হইবে।