শেয়ারবাজারে ফের কারসাজি!

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৫
গত দুই মাসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩০টি কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই স্বল্প মূলধনী এ কোম্পানিগুলোর দাম ক্ষেত্র বিশেষে ৫০০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি বেড়েছে। ফলে শেয়ারবাজার ঘিরে কারসাজি চক্র ফের তত্পর হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে কারসাজির ফলে কিছু কোম্পানির শেয়ার দর মাত্রাতিরিক্ত চড়ে গেলেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। কিছু পদক্ষেপ নিলেও তা যথেষ্ট এবং দ্রুত নয় বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এ সম্পর্কে বলেন, গোটা শেয়ারবাজারের সূচক যেখানে কমছে, সেখানে স্বল্প মূলধনী কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর তর তর করে বেড়ে যাচ্ছে। সুতরাং এখানে কারসাজি হচ্ছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা ধরতে পারছে না। তিনি বলেন, এ ধরনের কারসাজি বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি জোরদার করতে হবে। ডিএসই, সিএসইকেও তত্পর হতে হবে। তবে এ ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পেছনে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে কিনা তা জানতে চেয়ে গত এক মাসে প্রায় ৩০টিরও বেশি কোম্পানির কাছে নোটিস দেয়া হয়েছে। প্রতিটি কোম্পানির কাছ থেকেই উত্তর এসেছে নেতিবাচক। অর্থাত্ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির মতো কোন কারণ নেই। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে, শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির মতো কোনো তথ্য নেই। এরপরও থেমে নেই এসব শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি। শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণ অনুসন্ধান করে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে ডিএসইসিকে নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। ১৫ দিনের ব্যবধানে যেসব শেয়ারের দাম ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে সেসব কোম্পানির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে বলা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও তদন্তের নির্দেশ ডিএসইকে দেয়ায় এ নিয়ে বিএসইসি’র আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে গত কয়েক মাস ধরে ডিএসই কর্তৃপক্ষ ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন (স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ) স্কিম প্রণয়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিভিন্ন তদারকিমূলক কার্যক্রমের দিকে খুব একটা নজর দিতে পারেনি বলে স্বীকার করেছেন ডিএসই প্রেসিডেন্ট আহসানুল ইসলাম টিটু। তবে স্কিমের কাজ শেষ হওয়ায় এখন এসব কাজে গতি আসবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। শেয়ারবাজারে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পরও কেন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিএসইসি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসইসি’র সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে সিরিয়াল ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিং ও সিন্ডিকেশন ধরা পড়ে। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ সফটওয়্যার কোনো এলার্ট দেয় না। এমনকি অস্বাভাবিকভাবে দর বাড়লেও কোনো কিছু ধরা পড়ে না। এরপরও অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর কোন দেশেই সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যারে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির ব্যাপারে এলার্ট দেয় না। তাই এক্ষেত্রে কোম্পানি ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে এ ধরনের ক্ষেত্রে কারসাজি হচ্ছে কিনা- তা ধরতে হয়। আমাদের শেয়ারবাজারে এতগুলো কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে যে লোকবল প্রয়োজন তা বিএসইসিতে নেই। তবে লোকবলের সঙ্কট আগামীতে কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘আই ওয়ান্ট টু বি গেইনার’ নামে একটি গ্রুপ খুলে শেয়ারবাজার সম্পর্কে ফেসবুকে গুজব ছড়াচ্ছে একটি চক্র। আরও কিছু গ্রুপে শেয়ারবাজার সম্পর্কে নানা ধরনের আগাম তথ্য ও ঘোষণা দেয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। টাকার বিনিময়েও শেয়ার কেনার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে এ গ্রুপগুলোতে। অথচ শেয়ারের দাম বাড়তে পারে বা কমতে পারে এ ধরনের পরামর্শ দেয়া ও গুজব ছড়ানো নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে বিএসইসি ও ডিএসই, সিএসই কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ডিএসই’র তথ্যে দেখা গেছে, গত এক মাসে ডিএসই’র সূচকে ওঠানামা থাকলেও নিম্নমুখী প্রবণতাই ছিল মূখ্য। অথচ কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর তর তর করে বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা লোভ সামলাতে পারছেন না। কিন্তু বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি দেখে বিনিয়োগ করার বিকল্প নেই। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া কারসাজির নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদেরকে সনাক্ত করার মাধ্যমে যথাযথ শাস্তির আওতায় নিয়ে আসারও দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা। অস্বাভাবিক হারে দর বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে যে কোম্পানিগুলোকে নোটিস পাঠানো হয়েছে সেগুলো হলো- রহিম টেক্সটাইল, স্টাইল ক্রাফট, সিভিও পেট্রোকেমিক্যালস, জেএমআই সিরিঞ্জ, দেশ গার্মেন্টস, আজিজ পাইপস, সোনারগাঁও টেক্সটাইল, মডার্ণ ডাইং, দুলা মিয়া কটন, রহিমা ফুড, সাফকো স্পিনিং, মুন্নু জুট স্টাফালার্স, লিবরা ইনফিউশন, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, লিগাসি ফুটওয়ার, বিডি অটোকারস, এএমসিএল (প্রাণ), বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি), ইনফর্মেশন সার্ভিস নেটওয়ার্ক, হাক্কানি পাল্প, নর্দান জুট, ইমাম বাটন, ইনটেক অনলাইন, বিডি ল্যাম্বস, সোনারগাঁও টেক্সটাইল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, সিএমসি কামাল এবং ফাইন ফুডস। এ সব কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাদের শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির পেছনে কোন মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।