ন তু ন জী ব ন

প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ২০:০২
আজকে সন্ধ্যাটা ওর কাছে ছিল অগ্নিপরীক্ষার মত। কেননা আজকে সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। কিছুদিন হল তাদের বিয়ের কথা হচ্ছে। তাদের দেখা হয়েছে বসুন্ধরায়। পরীক্ষার মত প্রশ্ন-উত্তর পর্ব চলল তাদের মধ্যে। এই এক-দুইদিন দেখা আর কথার মধ্যদিয়ে ওকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে সে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে উপযুক্ত কিনা? লিনার বাড়ি আসার পর কাঁদতে ইচ্ছা করছে কেননা কেমন লাগল, কি কথা হল ছেলেটার সাথে পরিবারের সবাইকে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা সন্ধ্যায় দিয়ে আসা পরীক্ষার চেয়েও কঠিন মনে হচ্ছে। লিনা জানে যে ওর বাবা-মা ওর উপর জোরাজুরি করবেন না। কিন্তু দু’তিনদিন দেখা, কথার মধ্যদিয়ে সে একজন মানুষকে কি চিনবে? যদি বেশিদিন আলাপ হয় তখন বিয়ে করতেই হবে এমন পরিবেশ তৈরি হবে। আর নইলে আজকে কালকের মধ্যেই মিলছে না বলতে হবে। তাহলে রাজি হয়ে ভাগ্যের সাথে জুয়া খেলবে নাকি মানা করবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। বিয়ে করলে শুধু ছেলেটি নয় তার পরিবারের সাথেও মিলে নিজের বাসা, চেনা জগত্ ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত ও কি শুধু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতে পারে? তারপরও কিছু একটা ওর করতেই হবে? জীবনে একটা বয়সে এসে সব মেয়েদেরই এমন একটা কঠিন পরীক্ষার মুখে এসে পড়তে হয়। যে পরীক্ষার জন্য মানসিক প্রস্তুতি বেশিরভাগ মেয়েরই থাকে না। যেমনটি আমরা দেখছিলাম লিনার ক্ষেত্রে। পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক করা হলে খুব অল্পদিনের মধ্যেই মেয়েটির নিজের জীবনের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নতুন বাসা, নতুন পরিবারের সাথে খাপ খাওয়ানোর পাশাপাশি সম্পূর্ণ অচেনা নতুন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে হয়। বছরের পর বছর বাবা-মায়ের সাথে থেকে যে স্বভাব গড়ে উঠেছে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে রাতারাতি তা বদলানো সম্ভব নয়। আবার দুটি পরিবার কখনই এক হতে পারে না। তাই বাবার বাড়ির মত শ্বশুরবাড়িও একই রকম হবে, সব মিলে যাবে এমন কল্পনাও করা অর্থহীন। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাই বুঝে চিন্তা করে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার মন-মানসিকতা তৈরি করে নিতে হবে। জীবনসঙ্গী নির্ধারণে শুধু সে নয় তার পরিবারকেও বুঝতে হবে। কেননা বিয়ের পর শুধু তাকে নয় তার পরিবারকেও আপন করে নিতে হবে। মেয়েটির অবস্থা বিবেচনা করে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ছেলে-মেয়ে পূর্ব পরিচিত হলে, প্রেমের মধ্যদিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও মেয়েটিকে বিয়ের সময় এসে মানসিকভাবে প্রস্তুতির অভাবে একই সমস্যায় পড়তে হয়। শিরীন- পরিসংখ্যানে মাস্টার্স ফাইনাল দিচ্ছে। শিরীন আর শুভ্র একে অপরকে প্রায় তিন বছর ধরে চেনে। শুভ্র শিরীনের চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র। চতুর্থ বর্ষে তাদের প্রথম পরিচয়। তারা মূলত একই বিষয়ে থিসিস করছে। পরিচয়, বন্ধুত্ব থেকেই পরস্পরকে পছন্দ। এতদিন পর্যন্ত ওরা খুবই ভাল আছে। ভবিষ্যত্ নিয়ে তাদের নানা পরিকল্পনা। শিরীনের পরিবার এখন শুভ্রর কথা জানে। পরীক্ষা শেষ হলে কিছুদিনের মধ্যেই হয়ত ওদের বিয়ে হবে। কিন্তু এতদিন পর এসে শিরীনের মনে হচ্ছে ওকি আসলেই শুভ্রর পরিবারের সাথে মানিয়ে চলতে পারবে? শিরীন শুভ্রকে চেনে কিন্তু ওর পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কে সবকিছুই অচেনা। এমন অজানা জায়গায়, অচেনা মানুষের সাথে কয়েকমাস পর সব সময় থাকতে হবে শিরীনকে সে কথা ভাবলেও ওর ভয় লাগছে। প্রেমিক বন্ধু হিসেবে সবসময় শুভ্রকে শিরীন পাশে পেয়েছে কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে ওর মনে হচ্ছে ওরা কেউই মানসিকভাবে প্রস্তুত না। তেমনি শুভ্রর কাছেও শিরীনের পরিবার সম্পূর্ণ অজানা। শিরীনের অবস্থা চিন্তা করে শুভ্র ওকে সাহস দেয়ার চেষ্টা করছে তবু সব চেনা জগত্ ছেড়ে এক অজানা রাস্তায় পাড়ি জমাতে হবে শিরীনকেই। শিরীন বুঝতে পারছে ও যদি নিজেকে মানসিকভাবে সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত না করে তবে তার পক্ষে সে পথ অতিক্রম করা কখনই সম্ভব না। তাই বাবা-মার নিজের মেয়ের জন্য পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে যেমন মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে তেমনি তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতেও সাহায্য করতে হবে। নতুন পরিবেশে ভয়ের কিছু নেই সে ব্যাপারটি উপলব্ধি করাতে হবে। কোন প্রকার মানসিক চাপ যেন অনুভূত না হয় সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাকে তার পছন্দের মানুষটিকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে হবে। যেহেতু ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ জীবনটি তার মেয়েকেই সেই ছেলেটির সাথে কাটাতে হবে সেজন্য তার মতামতটি সবচেয়ে জরুরি। তাই পূর্ণবয়স্ক মেয়েটির জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার শুধু তারই আছে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপাচাপি, পরামর্শ অনেক সময় নারীর মধ্যে বিয়ের বিষয়ে একধরনের ভীতি তৈরি করে যা এই বয়সের জন্য খুবই ভয়ংকর। অনেক সময় বিয়ের প্রতি অনীহাও জাগিয়ে তোলে, তা থেকে জীবনসঙ্গী ছাড়াই জীবন পথ পার করে দেয় অনেক নারী। তাই এ বিষয়গুলোতে অভিভাবক হিসেবে সচেতন থাকতে হবে। মেয়েটির মনে সাহস জোগাতে, জীবন পথের এ পরীক্ষা অতিক্রম করতে অভিভাবকের পাশাপাশি জীবনসঙ্গীকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ছবি: প্রীত রেজা, মেহেদী হাসান