একটা সময় ছিল, বাংলাদেশ জাতীয় দল বলতেই চট্টগ্রামের এক ঝাঁক তারকার ঝলকানি বোঝাতো। একই সঙ্গে জাতীয় দলে দাপটের সঙ্গে খেলতেন আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, নুরুল আবেদীন নোবেলরা। পরেও নাফীস ইকবাল, তামিম ইকবাল, আফতাব আহমেদ থেকে শুরু করে নাজিমউদ্দিন পর্যন্ত দাপটটা ছিল। কিন্তু ঘটনা চক্রে আগামীকাল সেই চট্টগ্রামেই বাংলাদেশ জাতীয় দল যখন টেস্ট খেলতে নামবে, তখন সেখানে ‘হোম বয়’ থাকবেন একজন মাত্র—তামিম ইকবাল খান!
চট্টগ্রামের আর দশ জন ক্রিকেটপ্রেমীর মতোই বিভাগের ক্রিকেটের এই ‘অবনতি’ কষ্ট দেয় তামিমকে। গতকাল সংবাদ মাধ্যমের সামনেই পরিষ্কার করে সেই কষ্টের কথা বললেন। সঙ্গে নিজের প্রত্যাশার কথাও বললেন। তারই চাচা, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক আকরাম খান এখন বোর্ড পরিচালক। তাই তামিম একজন চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে নিজের দাবিটা পরিষ্কার করে দিলেন, ‘একসময় চট্টগাম থেকে নয়জন ক্রিকেটার খেলেছেন জাতীয় দলে। এখন আমি একাই আছি; দলে ঢাকার লড়াইয়েও তেমন কেউ নেই। আমি আকরাম খানের কাছে অনুরোধ করব, এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্য, চট্টগ্রামের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয়ার জন্য চেষ্টা করবেন। যত বেশি সম্ভব ক্রিকেটার বের করার চেষ্টা করবেন। আমি নিশ্চিত, উনি ক্রিকেটের ভালোই করতে চাইবেন।’
বাড়ির উঠোনে খেলা, শহরের ছেলে হিসেবে এখানকার ক্রিকেট, ক্রিকেটার এবং চাচাকে নিয়ে কথা বলতে হল। কিন্তু এ নিয়েই পড়ে থাকতে তো আর পারছেন না। রাত পোহালেই তাকে নামতে হবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট লড়াইয়ে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তামিমের অসাধারণ কিছু স্মৃতি আছে। এই দলটির বিপক্ষে ২০০৮ সালের ডানেডিন টেস্টে ৫৩ ও ৮৪ রানের ইনিংসের ভেতর দিয়ে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তার। পরে দলটির বিপক্ষে আরো দুটি ওয়ানডে ফিফটি ও একটি টেস্ট ফিফটি করেছেন। একই সঙ্গে একটা আফসোসও আছে তামিমের—নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াশ করা ঐতিহাসিক সেই সিরিজেই দলে ছিলেন না এই মারকুটে ওপেনার। ইনজুরির জন্য ২০১০ সালের সে সিরিজে ‘এক নম্বর সমর্থক’ হয়ে মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি।
এবার আর সমর্থক নয়, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অনেক প্রত্যাশার এই সিরিজে তামিমকে ‘নায়ক’-এর ভূমিকায় নামতে হবে। তামিম বলছেন আরেকবার ২০১০ কাণ্ড ঘটানোটা সহজ হবে না। তবে আশাও দিচ্ছেন এই বাঁহাতি। আশার পেছনে নিজের উপস্থিতিটাও কম বড় করে দেখছেন না তামিম, ‘ওইরকম কিছু করতে হলে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হবে। ওরা ভালো দল, সম্প্রতি খেলছেও ভালো। আমরাও ভালো খেলছি। যদি আমাদের কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারি, আমার মনে হয় আমাদের সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ব্যাপার এই যে, এবার আমি আছি, ভেট্টোরি নেই।’
হ্যা, ভেট্টোরির নাম থাকাকেও বড় এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া হিসেবেই দেখছেন তামিম।
তবে এসব আশাবাদী কথা খুব যুক্তি দিয়েই বলার চেষ্টা করলেন দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল-আক্রমণাত্মক এই ব্যাটসম্যান। তিনি বলছেন, সিরিজটা খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজেদের সামান্য হলেও এগিয়ে রাখছেন তামিম, ‘শক্তির বিচারে আমার মনে হয় না ওদের থেকে আমরা কোনো অংশে কম। সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে ফল আমাদের পক্ষে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। শেষ দশটি টেস্টের চেয়ে এই সিরিজটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। শেষ কয়েকটি সিরিজ যদি দেখেন, দেশের মাটিতে আমরা ভালো খেলেছি। রেজাল্ট হয়ত আমাদের পক্ষে আসেনি, কিন্তু খুব ক্লোজ ম্যাচ হয়েছে। এবার ফলটা আমাদের পক্ষে আনার চেষ্টা থাকবে।’
সেই ফলটা পক্ষে আসতে পারলেই তো আরেকবার ইতিহাস হয়ে যাবে। আর এই ইতিহাসের অংশ হওয়ার জন্য তামিম যে মুখিয়ে আছেন, সেটা একটুও লুকানোর চেষ্টা করলেন না, ‘সেই ইতিহাসের সঙ্গে (ওয়ানডে হোয়াইটওয়াশ) অনেক পার্থক্য আছে, তা ঠিক। ওটা ছিল ওয়ানডে সিরিজ, এবার টেস্ট সিরিজ। টেস্ট ক্রিকেটে আমরা নিজেরাও জানি আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে, উন্নতির অনেক জায়গা আছে। তবে, আমরা এটাও জানি যে, শক্তিতে এবং আত্মবিশ্বাসে আগের চেয়ে অনেক এগিয়ে আমরা। সেবার আমি খেলতে পারিনি, তবে ড্রেসিং রুমে ছিলাম। অনেক মিস করেছি অবশ্যই। যে আনন্দটা সেবার সবার মাঝে দেখতে পেয়েছিলাম, আশা করি এবার তেমন কিছুর অংশ হতে পারব আমি।’
