ব্যাংকের উচ্চসুদের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫৯
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিশ্ব বাজারে মন্দা এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের চলমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে ব্যাংকের ঋণের উচ্চ সুদ হারের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গতকাল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সুদহার কমাতে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে সে বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, বিনিয়োগকারীরা ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ সুদ হারে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এজন্য শিল্প টিকিয়ে রেখে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা এ বিষয়টি বলে আসলেও কমানোর জন্য এতদিন কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ব্যাংক সুদের হার ও চার্জ’ বিষয়ক এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আকরাম উদ্দিন, এ কে আজাদ, বর্তমান প্রথম সহ-সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন, বিজেএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বক্তৃতা করেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পারটেক্স গ্রুপ ও ইউসিবিএলের চেয়ারম্যান এম এ হাশেম, র্যাংগস গ্রুপ ও ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান এ রউফ চৌধুরীসহ বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। সেমিনারে অর্থমন্ত্রী বলেন, সুদ হার কমানোর জন্য সবার আগে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রয়োজন হয়। এছাড়া ঋণের প্রবাহ ভূমিকা রাখে। এজন্য সরকারি ঋণ কমিয়ে রেখে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহকে আমরা সবসময় উদ্বুদ্ধ করেছি। অন্যদিকে বর্তমানে কর্পোরেট ট্যাক্স অনেক বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এটার সমন্বয় করার চেষ্টা করছি। সুদের হার কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীদের অনেক সমস্যা রয়েছে, সুদহার কমানোর বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। খেলাপি ঋণ বেশি হলে সুদহার কমানো ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোতে অতি সতর্ক ও ঋণগ্রহীতার মান দেখতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর জৌলুসপূর্ণ শাখা খোলার প্রয়োজন নেই। বিদেশি ঋণের কারণে অর্থনীতি স্থিতিশীল আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা রয়েছে তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। দেশের অর্থনীতি পার্শ্ববর্তী যেকোন দেশের তুলনায় অনেক স্থিতিশীল রয়েছে। সুদহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোতে ধীরে ধীরে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এতে ব্যাংকের নিজস্ব নিয়মেই সুদহার কমবে। এজন্য একটু ধৈর্য ধরতে হবে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ মেয়াদী ও চলতি মূলধনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুদের হার সবচেয়ে বেশি। উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ ব্যয়বহুল হওয়ায় উত্পাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে যার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়ছে। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে না পেরে শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, উচ্চসুদের কারণে ভাল উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে দেশি ব্যাংকের পরিবর্তে বিদেশি উত্স থেকে ঋণ সংগ্রহ করছেন। এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান একে আজাদ বলেন, উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যাংকগুলোতে ৭০ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। ঋণ নেয়ার মত কেউ নেই। অনেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। প্রবন্ধে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যাংক সুদের হার বেশি। ব্যবসা- বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে ব্যাংক সুদের হার কমানো জরুরি। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা ব্যয়, খেলাপি ঋণ এবং কর্পোরেট ট্যাক্স কমানো গেলে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) কমবে। তখন ব্যাংকের সুদের হারও কমে যাবে।