বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থার সমঝোতার উদ্যোগ নতুন কিছু নয়। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থাকে ঘিরে সামপ্রতিককালের চলমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর আবার সক্রিয় আবির্ভাব ঘটেছে। এর আগে ২০০৬ সালে বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন কিনা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ আজিজই থাকছেন কিনা— সে প্রশ্নে বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য করতে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা সক্রিয় ছিলেন ‘টুয়েসডে গ্রুপ’ নামে কয়েক সদস্যের ছোট্ট একটি সংস্থার মাধ্যমে। এখন তারা বেশি সংখ্যক সদস্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ নামে। এদের সবার অগ্রভাগে রয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও বেশ সক্রিয়। বাদ নেই যুক্তরাজ্য কিংবা মুসলিম দেশগুলোও। প্রশ্ন হলো, তাদের এ ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আসলেই কি কাজে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বর্তমানের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর অবস্থানকে পর্যালোচনা করা যাক।
বাংলাদেশ সফরকালে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং ভারতের এক সময়ের অর্থমন্ত্রী (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) প্রণব মুখার্জি সরকার ও বিরোধীদলকে সংলাপের মাধ্যমে সংকট মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এছাড়াও মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনা বিভিন্ন সময় অনেকবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তো দু’নেত্রীকে চিঠি লিখে সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন। নিজস্ব দেশের পক্ষ থেকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণও। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বিগ্ন হয়ে এবার প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ১০টি দেশের কূটনীতিকরাও সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এভাবে নিজেদের জড়ায়নি এসব দেশ। আবার চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুনের মন্তব্যও প্রকাশ পেয়েছে এই প্রথম।
২০১২ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ-মহাসচিব বান কি মুন চিঠিতে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর এ বছরের মে মাসে তিনি জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে পাঠালেন সেই সংস্থার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে। তিনি এসে জানালেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ। সব দলের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এমনটাই চায় জাতিসংঘ দ্বিতীয় দফায় বান কি মুন মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৩ আগস্ট দুই নেত্রীকে সরাসরি টেলিফোন করে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাই সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না সংস্থাটি। সেপ্টেম্বরে ১৫ দিনের বাংলাদেশ সফরে ইইউ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া বিশেষ দূত উইলিয়াম হানা এমনটা জানান।
বছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচিত বিভিন্ন ইস্যুকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া গুরুত্বের সঙ্গে কাভারেজ দিচ্ছে। একইসঙ্গে উপস্থাপন করছে নানান দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ। শাহবাগ আন্দোলন, হেফাজত ইসলাম-এর সমাবেশ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এসবের সঙ্গেই তুলে ধরা হয় আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপট। উঠে আসছে সরকার এবং বিরোধীদলের মুখোমুখি অবস্থানের চিত্র। আগামী নির্বাচনের স্বচ্ছতা কিংবা নির্বাচন আদৌ হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় দেখা যায় বিদেশি গণমাধ্যমের এসব প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের ১৪ আগস্টে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডিসেন্ডস ইন্টু কেয়স’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ‘আরও বিক্ষোভ হবে’ বলে উল্লেখ করে লেখে— ২০১৪ সালের শুরুতে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও কী পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব বিক্ষেভের সমাপ্তি হবে হয়তো আরো হতাহতের মাধ্যমে। যুক্তরাজ্যের সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্যা ইকোনোমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল বিরোধীদলের যে কোনো দাবি-দাওয়াকে ভিত্তিহীন প্রতিপন্ন করে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের সংখ্যায় ‘দ্য ব্যাটেলিং গেমস’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ পায়। আবার সরকারের অনড় অবস্থান আর বিরোধীদলের তত্ত্বাবধায়কসহ বিভিন্ন দাবির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে যুক্তরাজ্যের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড প্রোটেস্ট কুড ডিরেইল বাংলাদেশ ইলেকশন’ শিরোনামের ১৮ জুনের অনলাইন প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ের বিদেশি উদ্যোগের ইতিহাস আসলে ভিন্ন বার্তা দেয়। ১৯৯৪-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলগুলো আন্দোলন করেছিল। সেই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৯৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কমনওয়েলথ মহাসচিব এনিয়াওকু এমেকা দুই নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। তিনি খুব একটা আশার আলো দেখতে না পেয়ে ১৩ অক্টোবর পাঠালেন তাঁরই বিশেষ দূত অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গর্ভনর জেনারেল নিনিয়ান স্টিফেনকে। অনেক চেষ্টার পর সমস্যা সমাধানের একটি ফর্মুলা তৈরি করেন নিনিয়ান। তিনি ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মন্ত্রীসভার প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রীসহ ৫ জন থাকবেন ক্ষমতাসীন দলের আর বাকি ৫ জন থাকবেন বিরোধীদলের। কিন্তু সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেছিল সে সময়ের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনতে ব্যর্থ হয়ে ২১ নভেম্বর ফিরে যান নিনিয়ান।
ইতোমধ্যে সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘোষণা করেছে। আর বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে। অর্থাত্ এবারও সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলটির মধ্যে বিরোধ শুরু হয়েছে। বিরোধী দল বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই নির্বাচন করতে হবে। সরকার বলছে, সংবিধান অনুসারেই নির্বাচন হবে। আর নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে তাদের এ অনৈক্য বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে।
স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বোচ্চ জায়গায় অবস্থান করেও আমরা বিদেশিদেরকে মধ্যস্থতার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। নিজ ঘরের সমস্যার নালিশ জানাই বিদেশ-বিভুঁইয়ের মানুষদের কাছে। অথবা বিদেশি কূটনীতিকরা কখনো কখনো নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে নাক গলানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, বিদেশিদের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের বিরোধ মীমাংসার চেষ্টায় কখনোই ইতিবাচক ফল মেলেনি। ১৯ বছর আগে নিনিয়ান যা পারেননি, আজ বান কি মুন কি তা পারবেন?
ঢাকা
