একটি দেশের অর্থনীতির উন্নতির ধারা বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং তার অর্জনের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। তবে দেশের যে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল তা এখন অনিশ্চিত বলা চলে। প্রবৃদ্ধির উন্নতির পেছনে অনেক কিছুই নজরে আনতে হয়। বিশ্ববাজারের সামগ্রিক বিষয় এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে হিসেবে বলা চলে এ বছর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদগণও। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিরাজমান সমস্যাদি ও জাতীয় প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধি বা মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) অর্জনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। সরকার ৭ দশমিক ৩ লক্ষ্যমাত্রা ধরলেও এক্ষেত্রে বড়জোর ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। সামনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রবৃদ্ধির হার আরো কমে আসতে পারে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক লক্ষ করা যায় প্রতি বছরই। বিতর্ক রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়েও। গত বছর সরকারের দাবি অনুযায়ী বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ শতাংশ । তা বাস্তবে মিলবে বড়জোর ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এডিবির মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও যে সরকারের সঙ্গে মতানৈক্য সৃষ্টি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাস্তবে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রায় সব ক্ষেত্রেই যে নেতিবাচক প্রবণতা বিরাজ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চলতি অর্থবছরে রফতানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে অনেকাংশে। বাজেটে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭.২ শতাংশ। চলতি অর্থবছর শেষে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫.৮ শতাংশ অর্জিত হতে পারে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে আরো বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে এবং তা প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার কমিয়ে দেবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইতোমধ্যেই দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ যথেষ্ট কমে গেছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার অনুষঙ্গ হিসেবে অন্যান্য খাতেও বিশৃঙ্খলা বেড়ে যেতে পারে এবং তা সেসব খাতের উত্পাদনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে। ফলে প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার কমে যাওয়ার ব্যাপারে এডিবি যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। এমনিতেই বিশ্বমন্দার প্রভাব এখনো সারা বিশ্বে রয়েছে। উন্নত অনেক দেশেই কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে না। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোও এর বাইরে নয়। মূলত তিনটি কারণে এশিয়ায় এ বছর প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। ফেডারেল রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রণোদনা কমিয়ে দেবে— এমন আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ইতোমধ্যেই এশিয়ার মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ার অর্থনীতির দুই চালিকাশক্তি ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবও পড়বে এশিয়ার অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি বছর এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশ। ২০১২ সালেও এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬.১ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এ প্রভাব একই রকম হবে। এর পরও রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়তো হতে পারতো কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আভাস পরিষ্কার নয়।
আগামী জাতীয় নির্বাচন কোন ধরনের সরকার পদ্ধতির অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা তৈরি হয়নি। সহসা সমঝোতা হবে এমনটাও আশা করা যাচ্ছে না। বিরোধী দল ঘোষণা করেছে, ২৫ অক্টোবরের পর থেকে তারা সর্বাত্মক আন্দোলনে নামবে। এর মধ্যে থাকবে হরতাল ও অবরোধসহ নানা ধরনের কঠোর কর্মসূচি। আর তাতে উত্পাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি কমে যাবে ও বিনিয়োগ আরো নিরুত্সাহিত হবে। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার বহু নজির আমরা অতীতে আমাদের রাজনীতিতে দেখেছি। কিন্তু আর কত? অর্থনীতির ক্ষতি করে কিংবা উন্নয়নকে ব্যাহত করে— এমন রাজনীতি আমরা চাই না। আমাদের রাজনীতিবিদরা আরো বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন আশা করি।
নারায়ণগঞ্জ
