ট্রাইব্যুনালের রায় ফাঁস নিয়ে ‘আষাঢ়ে গল্প’

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৩, ২৩:১২
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ফাঁস হওয়া নিয়ে ‘আষাঢ়ে গল্প’ সাজাচ্ছে পুুলিশ। এ অভিমত আইন বিশেষজ্ঞদের। তারা বলেছেন, দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক একজন পরিচ্ছন্ন কর্মীর ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে প্রবেশের অবাধ সুযোগ ছিল—পুলিশের এ ধরনের দাবি হাস্যকর। রায় তৈরির মতো গোপনীয় ও স্পর্শকাতর কম্পিউটার এতো অরক্ষিত ছিল তা ভাবা যায় না। গত ১ অক্টোবর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায় ঘোষণার আগের রাতেই বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ও ওয়েবসাইটে ১৬৪ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশ হয়। অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো দাবি করেছে, আইন মন্ত্রণালয়ের ৬ষ্ঠ তলায় একটি কম্পিউটারের ‘ডি-ড্রাইভে’ এই রায়ের কপি পাওয়া যায়। কম্পিউটারে প্রতিটি ফাইল বা ডকুমেন্টের উত্স নির্ণায়ক তথ্য ওই ফাইল বা ডকুমেন্টে সংরক্ষিত থাকে। ওই ফাইল বা ডকুমেন্টের প্রপার্টিজ অপশনে গেলে এ তথ্য পাওয়া যায়। এ রায়ের কপিটি যে ফাইলে পাওয়া গেছে তার প্রপার্টিজ পরীক্ষা করে দেখা যায় ‘ডি-ড্রাইভ’ এর আলম নামক ফোল্ডারের সাব ফোল্ডার ‘ডিফারেন্ট কোর্টস এন কোর্টস ক্রিয়েশনের’ মধ্যে আরেকটি সাব ফোল্ডার ‘চিফ প্রসিকিউটর-ওয়ার ট্রাইব্যুনাল’ এর মধ্যে রাখা রায়ের খসড়া কপিটির নাম ছিলো ‘সাকা ফাইনাল-১’। ফাইলটির প্রপার্টিজ অপশনে দেখা যায় ফাইলটি তৈরি করা হয়েছে ২০১৩ সালের ২৩ মে ১২ টা ১ মিনিটের সময়। ফাইলের সাইজ ১৬৭ কিলোবাইট। মোট পৃষ্ঠা ১৬৪। ট্রাইব্যুনালের রায়টি ছিলো ১৭২ পৃষ্ঠার। ১৬৪ পৃষ্ঠার পর বাকি অংশগুলো ছিলো আদেশের অংশ। অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলোর এ দাবি সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ের সেই কম্পিউটার জব্দ করেনি পুলিশ। এমনকি তদন্তের স্বার্থে আইন মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি পুলিশ। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আইন সচিব তাকে জানিয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটারে ট্রাইব্যুনালের রায় সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। অনলাইনে খসড়া রায় প্রকাশের দু’দিন পর ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি) করা হয়। জিডিতে কাউকে সরাসরি দায়ী করা না হলেও প্রেস ব্রিফিং-এ রেজিস্ট্রার আশংকা প্রকাশ করে বলেন, ‘সার্বিক বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এটা অনুমান করা হচ্ছে যে, কথিত খসড়া রায় ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কম্পোজ করার পর কোন না কোনভাবে তা লিকড হয়েছে।’ এরপর তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির পক্ষ থেকে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে ইন্সপেক্টর ফজলুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় নয়ন আলী ও ফারুক নামে ট্রাইব্যুনালের দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়। পরে ডিবি পুলিশ এক প্রেস ব্রিফিং-এ দাবি করেছে, নয়ন আলী ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে তিনদফায় রায়ের খসড়া কপি পেনড্রাইভে নিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুলের জুনিয়র মেহেদী হাসানকে দেন। নয়ন আলী ট্রাইব্যুনালের একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী। তিনি দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করেন। তার দৈনিক বেতন ১২০ টাকা। ডিবি পুলিশ দাবি করেছে, ওই পরিচ্ছন্ন কর্মী কম্পিউটার কম্পোজ করতে জানতেন। ট্রাইব্যুনালের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের রায় লেখার কম্পিউটারে প্রবেশের অবাধ সুযোগ তার ছিল। সেই সুযোগে তিনি পেনড্রাইভে করে রায়ের খসড়া নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। ডিবি আরো দাবি করেছে, নয়ন আলী আগে থেকে জানতেন না যে পেনড্রাইভে করে তিনি যা নিয়ে যাচ্ছেন তা রায়ের কপি! ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, অ্যাডভোকেট এম আসাদুজ্জামানসহ সুপ্রিম কোর্টের বেশ কয়েকজন আইনজীবী এ ঘটনাকে আষাঢ়ে গল্প বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন, তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন যে, যে কম্পিউটারে রায় লেখা হতো সেটি ইউজার নেইম ও পাসওয়ার্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ প্রসঙ্গে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার বলেন, পাসওয়ার্ড দেয়া কম্পিউটারে পাসওয়ার্ড জানা না থাকলে অন্য কারোর প্রবেশের সুযোগ নেই। কম্পিউটার বিষেশজ্ঞরা বলেন, নয়ন আলী আগে থেকে জানতেন না—পুলিশের এমন দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়। কেননা রায়ের কপি একটি সুনির্দিষ্ট ফাইলে সংরক্ষিত থাকে। অনেক সময় ফাইলেরও পাসওয়ার্ড দেয়া থাকে। ফাইলটি কোন ড্রাইভের কোথায় আছে এবং তাতে কি আছে তা জানা না থাকলে কারোর পক্ষে পেনড্রাইভে করে ১৬৪ পৃষ্ঠার খসড়া রায় নেয়া সম্ভব নয়। ট্রাইব্যুনালের গোপনীয় দলিলে নয়ন আলীর মতো একজন পরিচ্ছন্ন কর্মীর প্রবেশের সব ধরনের অধিকার ছিল—এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবীরা। তারা আশংকা করছেন, নয়ন আলী হয়তো আদালতে গিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে পুলিশের শেখানো কথাগুলোই বলবে। যেভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আদালতে সাজানো জবানবন্দি দিয়েছিল বহুল আলোচিত জজ মিয়া। পুরো বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবীরা। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, নয়ন আলী যদি সত্যি সত্যিই কম্পিউটার সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়, তাহলে এ ধরনের একজন লোক দৈনিক ১২০ টাকা মজুরির কাজ করবেন কেন? আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের চেম্বারে তল্লাশি চালিয়ে যে কম্পিউটারটি জব্দ করা হয় তা সিলগালা করে জব্দ করা হয়নি। এমনকি জব্দ করার সময় ওই চেম্বারের কোন আইনজীবী ছিলেন না। ফলে ওই কম্পিউটারে পরবর্তীতে অনেক কিছু ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব।