চট্টগ্রামের জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত মো. হাবিবুর রহমান (২২) চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। বিস্ফোরণ এবং মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বাসভবন থেকে এসিড উদ্ধারের ঘটনায় নগরীর খুলশী থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলাতেই মাদ্রাসাটির পরিচালক হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পুলিশ গতকাল সকালে মাদ্রাসা থেকে একটি গ্রেনেড উদ্ধার করেছে। এর আগে শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে তারা মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেয়।
এদিকে মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। গতকাল এক যুক্ত বিবৃতিতে তারা এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে মাদ্রাসা খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া মাদ্রাসা বন্ধ ও মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে জেলার হাটহাজারীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ‘কওমী মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ’।
গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে মাদ্রাসাটির ছাত্রাবাসের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত চারজনকে চমেক হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়। নিহত হাবিব মাদ্রাসার ছাত্র কিনা পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারেনি। সে ওই মাদ্রাসার ছাত্র নয় বলে দাবি করেছে হেফাজত। তার লাশ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। গতকাল বিকাল ৫টা পর্যন্ত কেউ তার লাশ নিতে আসেনি বলে চমেক সূত্র জানায়। এছাড়া গুরুতর আহত মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মো. নুরুন্নবীকে সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। জোবায়ের আহমেদ ও মো. সালমান আহমেদ নামে আহত অপর দু’জনকে মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির কর্তব্যরত নায়েক হামিদুর রহমান জানান।
মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ এবং অধ্যক্ষের বাসভবন থেকে ১৮ বোতল এসিড উদ্ধারের ঘটনায় গতকাল দুপুরে নগরীর খুলশী থানায় দুটি মামলা করেন উপ-পরিদর্শক গোলাম নেওয়াজ। দুটি মামলাতেই মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীকে ১নং ও তার ছেলে হেফাজতে ইসলামের সাহিত্য ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহারকে ২নং আসামি করা হয়েছে। বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রথম মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা অনেকজনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনের অপর মামলায় শুধু মুফতি ইজহার ও হারুন ইজহারকে আসামি করা হয়েছে।
বিস্ফোরক মামলার এজাহারভুক্ত অপর ১০ আসামি হলেন মো. নুরুন্নবী (৩০), মো. সালমান আহমেদ (২০), হাবিবুর রহমান (২৪), জোবায়ের আহমেদ সমীর (২৫), মো. ইকবাল, মো. হাবিবুর রহমান (২২), মো. ইসহাক (৩৩), মো. মনীর হোসেন (৫৫), আব্দুল মান্নান (২৬) ও তফসির আহমেদ (২৬)। এদের মধ্যে ৫ জনকে সোমবার রাতে মাদ্রাসা থেকে আটক করে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মুফতি ইজহার ও হারুন ইজহারসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বিস্ফোরণের ঘটনার জের ধরে পুলিশ গতকাল সকালে মাদ্রাসাটি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। বেলা ১১টার মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা ছেড়ে যাওয়ার পর পুলিশ মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান নেয়। কয়েকজন ছাত্র ইত্তেফাককে বলেন, পুলিশ একরকম জোর করে তাদের মাদ্রাসা থেকে বের করে দেয়। উল্লেখ্য, নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি ও হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী এ মাদ্রাসার পরিচালক ও অধ্যক্ষ।
এদিকে মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণ ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে হেফাজত নেতারা বিবৃতিতে বলেছেন, বৈদ্যুতিক আইপিএস ও রান্নার চুলা থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনাকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে এবং কতিপয় মিডিয়ার কারসাজির মাধ্যমে ‘বোমা ও গ্রেনেড তৈরির গল্পগু’ বানিয়ে মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং কওমী মাদ্রাসা বন্ধের ষড়যন্ত্র থেকে সরকার বিরত না হলে কঠোর ও দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে পুরো দেশ অচল করে দেয়া হবে বলে তারা হুমকি দিয়েছেন।
বিবৃতিদাতার মধ্যে রয়েছেন সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, নায়েবে আমীর মাওলানা হাফেজ শামসুল আলম, আমীরে শরীয়ত মাওলানা শাহ্ আহমদুল্লাহ আশরাফ, মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী প্রমুখ।
হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, মাদ্রাসায় রহস্যজনক বিস্ফোরণের ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ডাক বাংলো চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে কওমী মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদের স্থানীয় শাখা। সমাবেশে বক্তারা বলেন, এ ঘটনা সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক। কারণ প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় কিছু দিন আগে প্রকাশ্যেই কওমী মাদ্রাসা বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রবীণ মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ শামসুল আলম। সমাবেশের আগে একটি মিছিল হাটহাজারী সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
