গাজীপুরের শ্রীপুরের যে এলাকায় আসোয়াদ নিট কম্পোজিট কারখানায় মঙ্গলবার রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, সেখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। ফলে পৌনে ছয়টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হলেও ঘটনাস্থলে দমকলের গাড়ি পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টারও বেশি বিলম্ব হয়। তাছাড়া বড় অগ্নি দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষেরও কোন সমন্বিত ব্যবস্থা ছিল না। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারখানা কর্তৃপক্ষের স্বল্প চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। মুহূর্তেই দানবে রূপ নেয়া ওই অগ্নিকাণ্ডের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে প্রাণ হারান কারখানার দুই কর্মকর্তাসহ সাতজন। দমকলের গাড়ি ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কম হতো বলে মনে করেন কারখানার মালিকসহ ফায়ার সার্ভিসের শীর্ষ কর্তারা।
পলমল গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আসোয়াদ নিট কম্পোজিট কারখানায় আগুন লাগার পর পরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন গ্রুপের পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান। গতকাল তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমরা পৌনে ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলেও তাদের প্রথম গাড়ি আসে প্রায় সাড়ে আটটার দিকে। ফলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যে সাতজন মারা গেছেন তারা মূলত আগুন নেভাতে গিয়ে আটকা পড়ে মারা যান।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। ফলে স্বভাবতই গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করেছে। তিনি বলেন, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এবং এটি অনেক বড় আকারে হওয়ায় কারখানার নিজস্ব প্রচেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তবে ওই কারখানায় বড় রকমের অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সমন্বিত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায়ও ঘাটতি ছিল বলে তিনি মনে করেন। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি মাওনায় একটি ফায়ার স্টেশন হওয়ার কথা রয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে শিল্পঘন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও ওই এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের কোন স্টেশন না থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, গাজীপুর, সাভারে সবচেয়ে বেশি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা। অথচ একের পর এক বড় দুর্ঘটনা আর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সতর্কবাণী সত্ত্বেও সরকার বা মালিকপক্ষের টনক নড়ছে না।
আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ‘ইন্ডাস্ট্রিঅল’ এর বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব শ্রমিক নেতা রায় রমেশ চন্দ্র গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রম ও শিল্পঘন এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়ে আসছি। ওই কারখানার কাছে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলে ক্ষতির পরিমাণ কম হতো। কারখানাগুলোর নিরাপত্তায় নেয়া পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
বিজিএমইএ’র উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ!
এর আগে গত নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা যান ১১২ জন শ্রমিক। ওই ঘটনার পর বিজিএমইএ ‘ক্র্যাশ’ প্রোগ্রামের নামে সব কারখানায় ক্রমাগতভাবে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ ও অগ্নি মহড়ার ঘোষণা দেয়। মাত্র দেড় মাস আগে অগ্নিকাণ্ডের শিকার পলমল গ্রুপের ওই কারখানাটিতেও মহড়া (ফায়ার ড্রিল) অনুষ্ঠিত হয়। সবকিছুই ঠিক আছে বলে প্রতিবেদনও দেয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, কারখানাটিতে ৩টি বিকল্প সিঁড়ি ছিল। চলাচলের পথে মালামাল পাওয়া যায়নি। প্রতি ফ্লোরের সিঁড়িতে বিকল্প বাতি এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল। ছিল পানির ব্যবস্থাও। তবে তাতে যে খুব একটা ফল আসেনি তা গত মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডই প্রমাণ করে। ফলে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সংগঠনটির অগ্নি নিরাপত্তা কার্যক্রম।
এ ব্যাপারে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম দাবি করেন, কারখানাটি সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্ট (কর্ম পরিবেশ সম্পন্ন)। তবুও এরকম দুর্ঘটনা ঘটলে আমাদের কী-ই বা করার আছে?
বিজিএমইএ’র তথ্যানুযায়ী, ক্র্যাশ প্রোগ্রামের অংশ হিসাবে মধ্যম শ্রেণির কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য অগ্নি নির্বাপণে পারদর্শী ৩০ জন প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গত ৯ মাসে প্রায় ১৪ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এভাবে ৩৫ হাজার কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের। তবে অগ্নি নিরাপত্তা কার্যক্রমে বিশেষ সুফল না আসায় তারা এখন তাকিয়ে আছে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তা কার্যক্রম’ এর দিকে।
