গাজীপুরের শ্রীপুরের পলমল গ্রুপের আস্ওয়াদ কম্পোজিট মিলস্ লিমিটেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭ জনের লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে নিহত কারখানার এজিএম রাশেদুজ্জামান মণ্ডল ও তার ভাগ্নে সহকারী ফিডারম্যান নাঈমুর রহমানের লাশ মঙ্গলবার রাতেই হস্তান্তর করা হয়। রাশেদুজ্জামানের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বেলবাড়ি গ্রামে। নাঈমের বাড়ি মিঠাপুকুরের ধলারপাড় গ্রামে। ৫ জনের লাশ গতকাল বুধবার হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা হলেন রংপুরের পীরগঞ্জের বেলবাড়ি গ্রামের সফিয়া সর্দারের ছেলে নিটিং অপারেটর খলিলুর রহমান, মিঠাপুকুরের ধলাপাড়া গ্রামের সালেক মিয়ার ছেলে অপারেটর রুবেল মিয়া, দিনাজপুরের পাবর্তীপুর উপজেলার তাজনগর গ্রামের এমরান আলীর ছেলে অপারেটর বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রামের রাজিবপুর থানার ভেলামারি গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে অপারেটর লাজু মিয়া রাজু ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ি থানার পশ্চিম দর্বিপুর গ্রামের লালচান মণ্ডলের ছেলে অপারেটর মিনহাজুল হক।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গতকাল কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে গেইটে নোটিস ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মহসিন জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রতিটি লাশের পরিবহন ও দাফন-কাফন খরচ বাবদ ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। কারখানার পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। আর বিজিএমই-এর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা করে দেয়া হবে। এছাড়া গাজীপুর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আরো জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি তদন্ত কমিটির রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে নির্ধারণের জন্য সুপারিশ করা হবে।
গতকাল নিহতের স্বজনরা কারখানার সামনে এসে আহাজারি করতে থাকেন। অনেকে স্বজনদের খোঁজ করছিলেন। লাশগুলো আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ার তাদের চেনার কোন উপায় ছিল না। এ কারখানায় চাকরি করে যারা বাড়ি ফেরেননি এমন কয়েকজনকে খুঁজতে থাকেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। তারা কারখানার গেইটের সামনে আহাজারি করতে থাকেন।
ওই কারখানার নিটিং অফিসার ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কালাদহ গ্রামের মোখলেছুর রহমান বাসায় ফেরেনি বলে তার প্রতিবেশী একই কারখানার শ্রমিক জুলহাস উদ্দিন জানান।
কারখানার সামনে স্বামীর খোঁজে কাঁদছিলেন দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরের বুলবুলের স্ত্রী সুমি আক্তার। তিনি জানান, প্রায় ৫ বছর ধরে বুলবুল কারখানার নিটিং অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। মঙ্গলবার রাতে তিনি বাসায় ফেরেননি।
কারখানা শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ফুলপুরের কালাদহ এলাকার মোকলেছুর রহমান, কুড়িগ্রামের রাজিবপুরের ভোলামারি এলাকার রাজু, মিঠাপুকুর এলাকার রুবেল ও দিনাজপুরের পশ্চিম দবরিপুর এলাকার মিনহাজ নিখোঁজ এখনও রয়েছেন।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান জানান, বুধবার ভোর ৪টা ১০মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি জানান, কারখানার নীচতলার স্টেন্টার মেশিনের চিমনি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার বর্গফুটের স্টিল স্ট্রাকচারের দ্বিতীয় তলার রুমের সর্বত্র আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
আক্তারুজ্জামান আরো জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ ফরিদ উদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত ছাড়া এ মুহূর্তে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছে না বলে ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করেন অগ্নিকাণ্ডে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গতকাল দুপুরে কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আগুনে পোড়া বিপুল পরিমাণ সুতা, কাপড় ও মেশিনপত্র। কিছু কিছু স্থানে পুড়ে যাওয়া মৃতদেহের হাড়গোড়ের অংশ বিশেষ ও তাদের পরিহিত কাপড়ের অংশ বিশেষ পড়ে রয়েছে। এ সময় কারখানার স্টোর কর্মকর্তা জুয়েল রানা জানান, আগুনে কারখানার ২ ও ৩ নম্বর ইউনিট সম্পূর্ণ এবং ৫ নম্বর ইউনিটের অংশ বিশেষের ৯৪টি নিটিং মেশিন, বিপুল পরিমাণ গ্রে-ফেব্রিক্স ও সুতা পুড়ে গেছে।
এদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: মহসিনকে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতেই তিনি তদন্ত শুরু করেছেন। প্রয়োজনে একজন বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত করা হবে। এ কমিটি ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
গতকাল কারখানাটি পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রহমত আলী, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল ইসলাম, শ্রীপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন সবুজ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসুল আলম প্রধান, পৌর মেয়র মোঃ আনিছুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
