সাম্য ও সামাজিক সংহতির ধর্ম ইসলামের ধর্মীয় উত্সবগুলির মধ্যে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, আশুরা, শবে কদর বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। এসব উত্সবের মূল তাত্পর্য হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মোত্সর্গের কঠোর ত্যাগ সাধনার প্রেক্ষাপটে আনন্দঘন সম্মিলন। গরীব দুঃখীদের মধ্যে দান খয়রাত করা, ভেদাভেদ ভুলে সকলের সাথে এ সম্মিলনে শরীক হওয়া, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি, কুরবানিকৃত পশুর মাংশ বিলিবন্টনের মাধ্যমে সামাজিকতার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে থাকে। সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই মহান ব্রত বাস্ত্তবায়নের মাধ্যমে সকলের জন্য সুখময় জীবন যাপন নিশ্চিত হয়। ব্যষ্টি থেকে সমষ্টি। ব্যক্তি কল্যাণের ওপরই রচিত হয় সমষ্টিগত কল্যাণের সৌধ। পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন, একে অন্যের প্রতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক সংহতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ যা অভিন্ন সত্তা হিসেবে কাজ করে। এই মূল্যবোধ সহসা কিংবা আরোপিত নির্দেশের বলে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ও ব্যবহারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্থিতি আকারে প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ লাভ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম এক বিরাট গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে থাকে। ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়েই মানুষের জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে। ধর্মীয় অনুশাসনমালা মানুষের আচার আচরণ প্রবৃত্তি প্রবণতার ওপর একটা গঠনমূলক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশ করে। মূলত: ধর্মীয় বিধি বিধান আচার অনুষ্ঠান মানুষের আত্মিক উন্নতি লাভের পথ নির্দেশ করে আর এই আত্মগত উন্নতির ওপর ভিত্তি করে সমষ্টিগত তথা সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর তাবত্ ধর্ম ও সমাজে স্ব স্ব সংস্কৃতি ও অবকাঠামো অবয়বে উদযাপিত ঊত্সবাদিতে মানবিক মূল্যবোধের সৃজনশীল প্রেরণার, সখ্যতা সৌহার্দ্য প্রকাশের অভিষেক ঘটে থাকে। নানান উপায় উপলক্ষে সম্প্রীতি বোধের বিকাশলাভ ঘটে থাকে, অবনিবনার পরিবর্তে বন্ধন, মতপার্থকের অবসানে সমঝোতার পরিবেশ সৃজিত হয়। সংহার নয় সেবাই পরম ধর্ম । সকল অশান্তি কলহ বিবাদে শান্তির সম্ভাবনা শুধু সহযোগিতা-সমঝোতাতেই। ধর্মীয় উত্সবগুলি সাধারণত বছরের বিশেষ সময়ে ও উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সকলের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ আসে-সংবছরের জমে থাকা দঃখ বেদনা মনোমালিন্য দুর করার একটা উপলক্ষ তাতে মিলে। ধর্মীয় উত্সবগুলি প্রায়শই কৃচ্ছ্রতা সাধন, আত্মত্যাগ ও আত্নোত্সর্গের প্রেক্ষপটে আনন্দের ও ত্যাগের হেতু হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। আত্ম কল্যাণ লাভের জন্য কঠোর ত্যাগ, সাধনা ও পরিশ্রমের পর আনন্দের সোপান হিসাবে এই উত্সবের আয়োজন। সে উত্সবে থাকে পরিতৃপ্তির আমেজ। আত্মোত্সর্গের পরিতৃপ্তিতেই অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা জাগে। সে জন্য ধর্মীয় উত্সবগুলিতে দান খয়রাত করা অর্থাত্ বিত্তবানগণ বিত্তহীন অসমর্থদের সাহায্য করে, আনন্দে সকলে সমভাবে অংশ গ্রহণ করে। অন্যের অতৃপ্তিকে নিজের অতৃপ্তি বলে মনে করে সবাই। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আহার্য দ্রব্য, সম্পদ -সামগ্রী এবং পবিত্র ঈদ উল আযহাতে জীব জন্তু উত্সর্গ করা হয়ে থাকে। উত্সর্গীকৃত এ সব সম্পদ -সামগ্রী জীব জন্তুর কোনো কিছুই বিধাতার দরবারে সরাসরি পৌঁঁছায় না। উত্সর্গকারীর পক্ষ থেকে নিবেদিত নিষ্ঠা ও সকৃতজ্ঞতা প্রকাশের ইচ্ছাটিই প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়ে থাকে। এই ধূলি ধরায় উত্সর্গীকৃত সব কিছুই করা হয় সকলের মাঝেই। যা কিছু উত্সর্গ করা হয় তা সবই আহার্য কিংবা মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যা অন্যের ক্ষুধা ও অভাব মিটিয়ে থাকে। সুতরাং দেখা যায় ধর্মীয় উত্সবের সকল কিছুই সামাজিকতার আদর্শ প্রতিফলনের মধ্যেই সার্থকতা লাভ করে থাকে। ঈদুল আযহা উদযাপনের মধ্যেও নিশ্চিতভাবে রয়েছে আত্মশুদ্ধির সুযোগসহ সহ বিশেষ সামাজিক তাত্পর্য। হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ. ) কে আল্লাহর উদ্দেশে উত্সর্গ করার মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে পালিত হয় ঈদুল আযহা। ইতিহাসের ধারাবাহিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানির মাধ্যমে আত্মোত্সর্গের পরিচয় দেয়া হয়। এই পশু কুরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসত্ উদ্দেশ্য ও হীনমন্যতাকেই কুরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উত্সবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্ত উত্সর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টার প্রতীকি প্রকাশ। ‘আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের মত পূত বোধন ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’ (কাজী নজরুল ইসলাম, কুরবানি, অগ্নি -বীণা)। সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব চরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কুরবানির মাংস গরিব আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ। হজ্ব পালন ঈদুল আযহা উত্সবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ্ব অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সকল দেশের মুসলমানগণ সমবেত হন এক মহা সম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলের অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরীফে একই পোষাকে, একই ভাষায় একই রীতি রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয় তার চাইতে বড় ধরণের কোনো সাম্য মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথায়ও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ্ব পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রং ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বাচনীয় সখ্যতা সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হতে পারে।
লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের চেয়ারম্যান ও
বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চীফ কো-অর্ডিনেটর
