ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের ভাসুবিহারে গত ২৩ ও ২৪ নভেম্বর দু-দিনব্যাপী মঞ্চস্থ হলো প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’। নাটক মঞ্চায়নকে কেন্দ্র করে ভাসুবিহারে উত্সবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, বয়সের নারী-পুরুষ ভাসুবিহারে এসে নাটক উপভোগ করে।
ড. সেলিম মোজাহারের রচিত মহাস্থান নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমি প্রযোজিত মহাস্থান নাটকটি এ যাবতকালের সর্ববৃহত্ প্রত্ননাটক। তিন শতাধিক শিল্পী-কলাকুশলীর অংশগ্রহণে নির্মিত প্রত্ননাটকটির মাধ্যমে মহাস্থানগড়ের আড়াই হাজার বছরের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের শৈল্পিক উপস্থাপন করা হয়। ঢাকা শিল্পকলা একাডেমি, বগুড়ার আমরা ক’জন শিল্পীগোষ্ঠী ও গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জের শিল্পীরা এই নাটকে অংশগ্রহণ করে।
২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় এর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মঞ্চসারথি নাট্যজন আতাউর রহমান, বিশিষ্ট নাট্যজন অধ্যাপক আবদুস সেলিম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন, বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ, পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঁইয়া ও শিল্পকলা একাডেমির সচিব বদরুল আনম ভূঁইয়া।
মহাস্থান নাটকে জাতিসত্তার ইতিহাসকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে সময়ের পরম্পরায় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত সময়কালকে একক গ্রন্থনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই নাটকে প্রাচীন শিকারযুগ থেকে শুরু করে বৈদিকযুগ, আদিবাসি পর্ব, রামায়ণের গীত, কালিদাসের কাব্য, চর্যাপদ, সুফিসামা, বৈষ্ণব পদাবলী, ব্রাহ্মসঙ্গীত, লোকগান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ব্রতচারীদের গান, পঞ্চকবির গান, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাস, কাব্যগীতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা পালাগান রূপে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাস, ঐতিহ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের যে আলোকিত অধ্যায় রয়েছে সেটাই মহাস্থান নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রাচীর বেষ্টিত এই দুর্গ নগরীর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন সময়কালের নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেক হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা এখানে রাজত্ব করেছেন। ‘মহাস্থান’ প্রত্ননাটকের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ের শাসন শোষণের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই স্থানটি এক সময় ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেও পরিগণিত হতো। ধর্মের বাণী বুকে নিয়ে কেউ মানবতার কথা বলেছেন। আবার কেউ মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। এসব কীর্তি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে ‘মহাস্থান’ নাটকে। এ প্রসঙ্গে নাটকটির নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘এভাবে বিশাল ক্যানভাসে পৃথিবীর আর কোনো দেশে আর্কিও ড্রামা মঞ্চস্থের নজির নেই।’ নাট্যকার সেলিম মোজহার বলেন, ‘বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী পুন্ড্রনগরের মহাস্থানকে কেন্দ্রভূমিতে রেখে মহামুনি গৌতম বুদ্ধের বাংলায় আগমনকাল থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী সময় পর্যন্ত নাট্য-আখ্যানে পুরো গল্পকে এক সাথে বলার চেষ্টা হয়েছে। বাংলা অঞ্চলের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পট পরিবর্তনের ইতিহাসের ‘জানা ও জনপ্রিয়’ গল্প এ নাটকের আখ্যানভাগ।’
