সাংবিধানিক এবং ফৌজদারি কার্য-বিধির ক্ষমতাবলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়ন করার চিন্তাভাবনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমান ব্যবস্থায় আগামী নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়ায় এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কমিশন। তাছাড়া ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জনমত জরিপে আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়নের পক্ষে অধিকাংশ মতামত এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতির কাছে সেনাবাহিনী মোতায়নের বিষয়ে পরামর্শ চাইতে পারে। অনানুষ্ঠানিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে কমিশনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ গত মঙ্গলবার এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীর নাম না থাকলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনাবাহিনীর সহায়তা নিতে পারবে। বিগত নয়টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেনাবাহিনী সহায়তা করেছে। আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও যদি কমিশন মনে করে তাহলে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়া হবে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭৩ (আরপিও) এর অধ্যায় ৫ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সেনাবাহিনী মোতায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সেনাবাহিনী মোতায়নের জন্য সহযোগিতা চাওয়া হবে। তবে কৌশলগত কারণে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
এদিকে গত বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়ন করা হবে।’ যদিও আইনশৃঙ্খলার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী না থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়নের সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ আবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৫নং অধ্যায়ে (২) বলা আছে, ‘সরকারের সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ কমিশনকে উহার দায়িত্ব পালনে সহায়তা প্রদান করিবে এবং এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি, কমিশনের সহিত পরামর্শক্রমে, তাহার নিকট উপযুক্ত বিবেচিত যে কোন নির্দেশ জারি করিতে পারিবেন।’ এই ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে সেনাবাহিনী মোতায়নের জন্য দাবি জানাতে পারে কমিশন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিশন থেকে সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হলে সরকার তাতে সাড়া নাও দিতে পারে। কারণ ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিল। এ বিষয়ে কমিশন থেকে দুটি চিঠি দেয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সে চিঠির জবাব দেয়া হয়নি। এ জন্য সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে সেনাবাহিনী মোতায়নের বিষয়ে পরামর্শ চাইবে কমিশন।
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) রাকিবউদ্দিন আহমেদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী রাখা না রাখা নিয়ে এক লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত কোন বিধান আরপিওতে ২০০১ সালের আগে ছিল না। তারপরও ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক শক্তির সহায়তার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। একই দিনে সারাদেশে ৩০০ আসনে একসাথে নির্বাচনের জন্য বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনের তাগিদেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ’
ইসির সূত্র মতে, চলতি বছর বর্তমান নির্বাচন কমিশন আরপি’র যে সংশোধনী এনেছে, সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে রাখা হয়নি। তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারা অনুযায়ী সংসদসহ সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারায় বলা আছে, কোথাও কোনো বেআইনি সমাবেশ হলে, বা জনশৃঙ্খলা নষ্ট হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশ বাহিনী তা ছত্রভঙ্গ করে দেবে। পুলিশ বাহিনী ব্যর্থ হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর পুরুষ কর্মকর্তাদের সহযোগিতা কামনা করতে পারবেন।
ইসির এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, দেশব্যাপী একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে ছয় লাখেরও বেশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেখানে সেনাবাহিনী বাদ দিয়ে এত সংখ্যক সদস্য মোতায়েন সম্ভব নয়।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
