দুর্গা পূজাতে মা আসেন ফিরে ফিরে

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৪৯
আমি যখন খুব ছোট ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়ি তখন থেকেই দুর্গা পূজার সেই খুশি আর আনন্দে ভরা দিনগুলোতে সবাইকে নিয়ে হৈ হুল্লোড় করি। পূজার ৭/৮ দিন আগেই আমার মা (স্বর্গীয় ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী) আমাকে বলতেন ‘সুমন তোর এবার পূজাতে কি চাই, প্যান্ট শার্ট আর কিছু?’ আমি তখন বলতাম ‘মা একটি গাড়িও লাগবে’ এই গাড়ি আবার সেই গাড়ি নয় যে সেটাতে চড়ে আমরা ঘুরে বেড়াব। এই গাড়ি হচ্ছে খেলনা গাড়ি। খেলনা গাড়ি আমার খুব প্রিয় ছিলো। তখন একটা গাড়ি পেলে মনে হতো হাতে যেন স্বর্গ পেলাম। যা হোক পূজার ৭ দিন আগে সেই প্যান্ট, জামা আর জুতো পেয়ে খুব যত্ন করে সেটা রেখে দিতাম। আর শুধু দিন গুনতাম কবে নতুন জামা প্যান্ট আর জুতো পরে পূজাতে যাবো। তখন মনে হতো, দিন যেন শেষ হচ্ছে না, এতো দেরিতে এক একটি দিন শেষ হয় কেন, তাই শুধু ভাবতাম। পূজার প্রথমদিন ষষ্টি হয় তার আগে মহালয়া উত্সব। নানা রকম গীত, পূজা আর আরাধনার মাধ্যমে দেবীকে নিয়ে আসা হয়। পূজা শুরু হয় মহালয়া উত্সবের ষষ্ঠ দিন থেকে তাই সেদিনকে বলা হয় ষষ্টি থেকে চলে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পর্যন্ত। দশমী অর্থাত্ বিজয়া দশমীর দিন দেবীকে বিসর্জন দেয়া হয়। দুর্গা দেবী ১০ দিন সবাইকে আনন্দ দিয়ে, আশীর্বাদ করে আবার চলে যান আমাদের ছেড়ে। দুর্গা পূজাতে আমাদের বাসায় সকল সমপ্রদায়ের লোকই আসতো, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এই ধরণীতে আসেন। তাই সকলকে সাথে নিয়েই আমরা দুর্গা পূজা করি। আমাদের আনন্দ আমরা সকলের সাথেই ভাগ করে নেই। সকলের সাথে পূজা করতে আনন্দ করতে আর পূজার প্রসাদ সবাই এক সাথে খেতে কি যে আনন্দ, তা বলে বুঝানো যাবে না। পূজাতে প্রসাদ হিসেবে প্রথম দেয়া হতো ফলমূল তাতে আপেল, কলা, আঙ্গুর, পেঁপে আর কত কি। দুপুরে দেয়া হতো ভোগ, তাতে খিচুড়ি সাথে লাবড়া অর্থাত্ নানান রকম শাকসবজি দিয়ে তৈরি নিরামিষ। সবাই প্রসাদ খেয়ে বলতো আহা কি মজা, এমন মজার খাবার কতদিন খাইনি। আমরা তাদের এই আনন্দ আর তৃপ্তি দিয়ে নিজেরাই আনন্দিত হতাম। সন্ধ্যায় হতো আরতি, সেই আরতির সময় ধূপ ধোঁয়ায় চারিদিক হয়ে যেতো গন্ধময় একটি ধোঁয়াশে পরিবেশ আর ঢাক, ঢোল কাশার শব্দ ধ্বনিতে আমরা সবাই নাচতাম। প্রতিমার সামনে হাতে ধূপ এর পাতিল নিয়ে আমিও নাচতাম। একবার ঘোষণা করা হলো যে ভালো নাচতে পারবে তাকে পুরস্কার দেয়া হবে। আমি তো সেদিন সন্ধ্যায় আরতির জন্য ধূতি পরে উপরে রঙ্গিন একটি পাঞ্জাবী পরে নাচ শুরু করলাম। জীবনে কখনো নাচ করিনি, শিখিওনি। কিন্তু ক্লাশ থ্রিতে পড়ার সময় সেই বয়সে ঢাক ঢোল আর কাশার ছন্দে ছন্দে যে নাচ করেছিলাম তা ভুলতে পারবো না, আপন ছন্দে যেন আমি নেচে চলছিলাম। পরে শুনলাম আমি নাকি পুরস্কারও পেয়েছি। সেই পুরস্কার পেয়ে আমার যে কি আনন্দ! আসলে পূজাতে যারা ঢাক ঢোল বাজায় তারা এমনই তালে তালে, ছন্দে ছন্দে বাজায় যেন নাচতে ইচ্ছে করে। তেমনি আমারও সে সময় নাচতে ইচ্ছে করছিল, তাই নেচে পুরস্কারও পেয়ে গেলাম। পূজায় আমরা এমনিই আনন্দ করতাম । আজ যে পূজায় আমরা যাই সেই পূজাতে হয়ত সেই রকম আনন্দ পাই না, পাই না সেই রকম আনন্দঘন পরিবেশ তবুও পূজা আসে, পূজা যায় আমরাও পূজা করি। আমার মা স্বর্গবাসী হয়েছেন তাই আমার জন্য এবারের পূজাও দুঃখের। মাকে ছাড়া পূজা করবো ভাবতেও পারি না। মা যেহেতু আমার বাসাতেই থাকতেন এবং সবসময় যেহেতু মা’র আদর স্নেহ পেয়ে আসছিলাম তাই মাকে আমার সর্বক্ষণ মনে পড়ে। পূজার দিন মা আমাকে কতো করে বলতেন ‘বাবা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে যাবি তো, আমার নামে তোর বাবার নামে পূজা দিয়ে আসিস, সাথে টাকা দিতেন, আমি নিতে না চাইলে বলতেন, এই টাকা তুই দিতে পারবি না এটা আমি মায়ের চরণে দিচ্ছি, তুইও দিবি তোরটা তোর সন্তানের জন্য। পূজার দিনে মা সকালে ঘুম থেকেই উঠেই স্নান করে নতুন শাড়ি পরে আমাদের পূজার ঘরে ঢুকে ধূপ ধুনা দিতেন। সেই ধূপের গন্ধে সারা ঘরে কি সুন্দর পরিবেশই না হতো। মাকে আজ মনে পড়ে, মা আমাকে কাপড় কিনবার জন্য টাকা দিয়ে বলতেন ‘বাবা তোর পছন্দমত একটি জামা কিনবি’। জামাটা কিনে মাকে বলতাম ‘মাগো দেখো এটা তোমার দেয়া শার্ট’। মা কতো খুশি হতেন, বলতেন ‘বাবা তোকে কত সুন্দর লাগছে’। তারপর আমার দুই ছেলে অনির্বাণ, নন্দন আর স্ত্রীকে ডেকে পূজার উপহার দিয়ে বলতেন, তোমরাও নতুন জামা কাপড় পরে আমাকে দেখাতে আসবে। দুর্গা পূজা এসেছে। এসেছে তৃনয়নী মা আমার শারদীয় এই দুর্গোত্সবে। আমরা আজ সবাই আমাদের দুর্গা মাকে বরণ করবো, তার পূজা করে আমাদের মাকে স্মরণ করবো আর কামনা করবো ‘জগত্ এর সকল প্রাণী সুখী হোক’। আমরা সবাই যেন সবার জন্য সুখে দুঃখে এগিয়ে আসতে পারি, সকলে দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নিতে পারি। দুর্গা পূজার আনন্দ যেন সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি। আমাদের মধ্যে হিংসা, হানাহানি সকল বিভেদ ভুলে গিয়ে আমরা সবাই যেন বন্ধু হতে পারি। তবেই দেবী দুর্গতি নাশিনী আমাদের মাঝে আসবেন, অসুরকে নাশ করবেন ,আমরা সবাই শান্তি ফিরে পাবো। জয় হোক মানবতার। লেখক: সিনিয়র কনসালটেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টিষ্ট্রি, বারডেম হাসপাতাল