দুর্গা রাধা লক্ষ্মী সরস্বতী ও সাবিত্রী— এঁদের সমন্বিত শক্তিই হলো ঈশ্বরের সৃষ্টি শক্তি। (ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ) দুর্গা হলেন তেজের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ...দেবী ভগবতীর সৃষ্টি রহস্য বড়ই অনুপম। একদা জয়াভিলাষী দেবতা ও দানবে তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। দানব দমনে ইন্দ্রাদি দেবতাগণ মহাপরাক্রমে যুদ্ধ করেও দানবদের নিকট পরাস্ত হয়ে ‘ত্রাহি ত্রাহি’ করতে লাগলেন। ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন দেবতাগণ। ব্রহ্মা বললেন, আমাদের স্বীয় শক্তির সমন্বয়ে এক মহাশক্তি সৃষ্টি করতে পারি। সেই মহাশক্তিই বিনাশ করবে দানবশক্তিকে। অতপর, ব্রহ্মার বদনমণ্ডল হতে স্বতই পদ্মরাগবত্ লোহিত বর্ণের তেজপুঞ্জ উদ্ভূত হলো। শঙ্করের শরীর হতে রৌপ্যবর্ণ তমোগুণসদৃশ তেজ নির্গত হলো। বিষ্ণুর শরীর হতে নীলকান্তি সত্ত্বগুণময় তেজ, দেবরাজের শরীর হতে বিচিত্র বর্ণের তেজ এবং কুবের, যম, অগ্নি, বরুণসহ অন্যান্য দেবগণের শরীর হতে দেদীপ্যমান মহত্ তেজ নির্গত হয়ে এক মহা তেজঃপুঞ্জের সৃষ্টি হলো। সেই তেজঃপুঞ্জ হতে অপূর্ব রমণী আবির্ভূত হলেন। এই বিশ্ববিমোহিনীর বদন শুভ্র, নেত্রত্রয় কৃষ্ণবর্ণ, অধরপল্লব প্রগাঢ় রক্তবর্ণ এবং পাণিতল তাম্রবর্ণ। “রামস্যানু গ্রহার্থায় রাবনস্য বধায় চ / রাত্রারেব মহাদেবী ব্রহ্মণা বোধিতা পুরা।” পুরাকালে রাবণ বধের নিমিত্তে ব্রহ্মা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে শ্রীরাম অকালে দেবীর বোধন করেন। সেই থেকে শরত্কালে আদ্যাশক্তি মা দুর্গার পূজা হয়ে আসছে। দুর্গমাসুরকে বিনাশ করে মায়ের নাম হলো দুর্গা। এছাড়া তিনি জগতের সকলের দুর্গতি দূর করেন বলেও দুর্গতিনাশিনী দুর্গা।
ব্রহ্মার পুত্র অত্রি, অত্রির পুত্র শশধর, শমধরের পুত্র বুধ, বুধের পুত্র চৈত্র, ‘চৈত্রের তনয় হয় সুরথ নৃপতি’। সুরথ রাজা প্রথম দেবী শক্তির পূজা করেন বসন্তকালে। যা এখনও ‘বাসন্তী’ পূজা নামে প্রচলিত। শারদীয়া দুর্গা পূজায় দেবীর সাথে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং কার্ত্তিক, গণেশ। আমরা এঁদের দেবীর কন্যা এবং পুত্র রূপে জ্ঞান করি। কিন্তু এঁরা প্রত্যেকেই দেবীর মহাশক্তির রূপকায়িত মূর্তি। কার্ত্তিক যুদ্ধশক্তি, গণেশ সিদ্ধিপ্রাপ্তি, দেবী সরস্বতী বাক ও জ্ঞানশক্তি এবং শোভা ও সম্পত্তির প্রতীক। এঁরা সবাই দেবী দুর্গার মহাশক্তি এবং ঐশ্বর্যের প্রতীক। ‘মহিষাসুর’ — কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাত্সর্যের সমন্বিত শক্তি। শিব হলেন সত্ত্ব, রজোঃ, তমো— এই ত্রিগুণের সমাহার এবং এই ত্রিগুণের সাম্যাবস্থাই প্রকৃতি অর্থাত্ মহাশক্তি দুর্গা। স্বয়ম্ভূ কখনো পুরুষ, কখনো প্রকৃতি, কখনো শূন্যাকাররূপে পূজিত হয়ে থাকেন। ‘দশভূজা’ অর্থাত্ বিপুল শক্তির ধারক ও বাহক। দেবগণ দেবীর দশহাতে দিলেন দিব্যাস্ত্র। হৃষীকেশ দিলেন ‘চক্র’, ভগবান শশাঙ্ক শেখর দিলেন ‘ত্রিশূল’, বরুণদেব দিলেন ‘শঙ্খ’, অনলদেব দিলেন ‘শতঘ্নী শক্তি’, অনিলদেব দিলেন ‘শরপূর্ণ তৃনীর এবং ধনু’, দেবরাজ দিলেন ‘মনোহর ঘণ্টা’, যম দিলেন ‘কমনীয় দণ্ড’, ব্রহ্মা দিলেন ‘গঙ্গাজলপূর্ণ দিব্যকমণ্ডল’। প্রত্যেকটি অস্ত্রের শক্তিতে দেবী হলেন মহাশক্তি। এর তাত্পর্য হলো —সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির দ্বারা যে-কোন অপশক্তির বিনাশ সম্ভব। দেবীকে সালঙ্কারা করা হলো। ক্ষীরোদসাগর দিলেন ‘রক্তবর্ণ বসন এবং মণিমানিক্যখচিত হার’, বিশ্বকর্মা দিলেন ‘অলৌকিক চুড়ামণি’ এবং বাহুতে দিব্য কেয়ূর, কঙ্কণ ও বলয়, চরণদ্বয়ে নূপুর’, মহার্ণব দিলেন ‘সুরম্য গ্রীবাভূষণ এবং রত্নজ্যোতিতে সমুজ্জ্বল অঙ্গুরীয় সকল’, হিমালয় দিলেন ‘সুবর্ণবর্ণ এক কেশরী’। এসব দেবীর ঐশ্বর্য, বীরত্ব, দৃঢ়তা, একাগ্রতার প্রতীক। সংগ্রামের জন্য যেমন সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির প্রয়োজন, তেমনি চাই ঐশ্বর্য এবং তেজস্বীভাব। কেশরী হলো পিতার ঐকান্তিক আশীর্বাদের নিগূঢ় শক্তির প্রতীক।
শাস্ত্র-তত্ত্বানভিজ্ঞ ব্যক্তি মৃন্ময়ী দুর্গামূর্তিকে কেবল দুর্গা জ্ঞান করেন কিন্তু জ্ঞানী ও শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রই জানেন ঈশ্বরকেই অবস্থা বিশেষে দুর্গা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। “ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব /ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব / ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিনং ত্বমেব/ ত্বমেব সর্বং মম দেবদেব”। এটিই সারকথা। দেবীর আগমনে পৃথিবীতে এক মহানন্দের উল্লাস মানুষের মনকে পার্থিব সকল দীনতা, হীনতা, জড়তা ভুলিয়ে দেয়। সকলেই হিংসা-দ্বেষ ভুলে প্রীতির বন্ধনে মিলিত হয়। ঘরে ঘরে বিশ্বভ্রাতৃত্বের মিলনের আনন্দ। দুর্গতিনাশিনী দুর্গার আগমনে সকলের জীবন হয়ে উঠুক শুভ্র, শান্ত, অমলিন।
লেখক: গবেষক
