অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিকীরূপে দুর্গা

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৫১
প্রতিবছর সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অপশক্তি বিনাশী সত্যানন্দ স্বরূপিনী দুর্গাপূজা এবং যুগপত্ আরাধনামূলক আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। এবারও ১৪২০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে শারদীয় খুশী ও আনন্দের আতিশয্যে সবাই বিভোর হয়ে পড়েছে। নীল আকাশে সাদা সাদা মেঘের ভেলা, তটিনীর তীরে শুভ্র কাশফুলের ঢেউ, শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে সদ্য পড়া শিউলী, স্থলপদ্ম ইত্যাদির আবর্তে প্রকৃতি এখন খুশীতে আত্মহারা হয়ে দেবী উমাকে বরণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। তাই সঙ্গত কারণেই দুর্গাপূজা আদিতে কি অবস্থায় এর উদ্ভব হয়, তা আমাদের জানা দরকার বলে প্রয়োজন মনে করি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, প্রচলিত শারদীয় দুর্গাপূজার উত্পত্তি ‘অকাল বোধন’ হিসেবে হিন্দু পুরাণের তাত্পর্য লক্ষণীয়। এ প্রেক্ষাপটে একটু যদি ভেতরে যাই, তাহলে দেখি এ উপাখ্যানে বর্ণিত আছে যে, ঋষি দক্ষের কন্যা সতীরাণী ছিলেন মহাদেবের (শিব) পত্নী। কিন্তু মহাদেব যত বড়ই হোক না কেন, সতীর পিতা দক্ষের প্রিয়ভাজন হতে পারেননি। এদিকে সতী খুব পিতৃভক্ত ছিলেন। পিতার যজ্ঞের সংবাদ পেয়ে বাবার বাড়ি যাবার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তাই স্বামীর মতামত উপেক্ষা করে একাই চলে যান পিতৃগৃহে। তাঁর পিতা দক্ষ সব দেব-দেবীকে নিমন্ত্রণ করলেন। কিন্তু শিব তথা মহাদেবকে কোন আমন্ত্রণ তো জানালেনই না বরং সকল দেব-দেবতার সামনে সুচারুভাবে শিব তথা মহাদেবের বিরুদ্ধে নিন্দা শুরু করেন। কিন্তু পিতার এ বিষয়টি সতী খুব একটা ভালভাবে নিলেন না এবং স্বামীর বিরুদ্ধে এহেন নিন্দার কারণে খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। একইসাথে স্বামীর নিষেধ অমান্য করার কারণে সতীর মধ্যে তীব্রভাবে অনুশোচনা আসে। শেষ পর্যন্ত পতিপরায়ণা সতী স্বামীর প্রতি অযথা নিন্দা সইতে না পেরে যোগ বলে আত্মাহুতি দিলেন। তখন এই দুঃখজনক বিষয়টি শুনে পত্নীহারা মহাদেব খুবই রাগান্বিত হলেন এবং তাঁর রোষে দক্ষ যজ্ঞ পুরোপুরি পণ্ড হয়ে যায়। এছাড়াও মহাদেব কিছুতেই প্রিয় স্ত্রীর কথা ভুলতে পারেন না এবং তার বিরহ সহ্য করতে না পেরে সতীর মরদেহ কাঁধে করে প্রলয় নৃত্য করতে থাকেন। এর ফলে স্বর্গ মর্ত্য কাঁপতে থাকে। তখন উপায়ন্তর না দেখে ভগবান বিষ্ণু শিবকে শান্ত করার নিমিত্ত সুদর্শন চক্র (বিশেষ ধরনের অস্ত্র) দ্বারা সতীর দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলেন। এতে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। আর মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বনিয়ন্তার অমোঘলীলায় এই সতীই পরবর্তীতে পিতা হিমালয় ও মাতা মেনকার ঘরে উমা নামে জন্ম নিলেন। উল্লেখ্য যে, মরণের পূর্বেই মহাদেবের প্রতি তিনি খুব অনুরক্ত ও দুর্বল ছিলেন বিধায় পুনর্জন্মের পরে পরিণত বয়সে তপস্যা বলে মহাদেবকে পুনরায় স্বামীরূপে বরণ করতে সমর্থ হন। তত্পর তাঁদের পর পর চারটি সন্তান হয়, যেমন-লক্ষ্মী (ধনদাত্রী), সরস্বতী (বিদ্যাদাত্রী), গনেশ (সিদ্ধিদাতা গণপতি) এবং কার্তিক (দেব সেনাপতি)। আর এই চার সন্তানদের বাহন হলো যথাক্রমে পেঁচা, শুভ্র রাজহাঁস, ইঁদুর এবং ময়ূর। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, শারদীয় প্রাতে দেবীবরণের পাশাপাশি পিতার বাড়িতে কন্যা বরণের রেওয়াজের বিষয়টি তাত্পর্যপূর্ণ। বাঙালি সংস্কৃতিতে অসূরবেধিনী দুর্গা তথা মাতঙ্গী বিশ্বজননী শুধু বরাভয় দাত্রীরূপেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, হয়ে উঠেন একান্ত ঘরের মেয়ে। এক্ষেত্রে সুরথ রাজা এবং রাজা রামচন্দ্রের অকাল বোধন পৌরানিক কাহিনীর সূত্র ধরে বাঙালি মনকে যতখানি নাড়া দিতে পারে তারচেয়ে বেশি বাঙালি মনকে অধিকতর আকৃষ্ট করে এই শারদীয় দেবীর উপাখ্যান। অবশ্য এর ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে অনেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে থাকেন। কিন্তু এটা অহেতুক বলে পরিগণিত। কেননা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর আদর্শ সম্বলিত মূল্যবোধের (Values) উপর জোর দেয়াই শ্রেয়। কারণ আচার-অনুষ্ঠান বাইরের খোলস বা আবরণ মাত্র। এক্ষেত্রে দেবী দুর্গা নারী শক্তিরূপে অসূরকে সমূলে মূলোত্পাটন করেন। তাই অসুররূপে অন্যায়, অবিচার, নৈরাজ্য ইত্যাদি অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত বাড়াবাড়ি চরম পরিণতির শিকার হয়। একদিন না একদিন ন্যায়ের কাছে অন্যায় বা অসত্য পরাভূত হয়েই থাকে। আর ইতিহাস এ প্রেক্ষাপটে সেই কথাই যুগ যুগ ধরে বলে আসছে এবং চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে থাকে। অবশ্য দুর্গাপূজার এত সাজগোজ ও আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানমূলক কর্মকাণ্ড অহেতুক মনে হলেও পরোক্ষভাবে নৈতিকতা সৃষ্টির পথ সুগম করে থাকে। অন্যায় করলে কেউ ধরায় টিকে থাকতে পারে না। শুধু সেই দর্শন বুঝানোর জন্য এ অনুষ্ঠান। অবশ্য এই আচার ভিত্তিক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রয়োজন আছে কিনা অনেকে তা সংশয় পোষণ করে। অথচ মনের অজান্তে অসত্ কর্ম থেকে দূরে থাকার সৌন্দর্য ঘেরা মূল্যবোধ ও আদর্শ সবিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। উল্লেখ্য যে, প্রাচীন হিন্দু বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী প্রতিবছর শরত্কালে দুর্গাপূজা আয়োজিত হয় পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার ও উড়িষ্যায়। তাছাড়া প্রবাসী সনাতনী বাঙালি এ পূজারও আয়োজন করে স্বল্প পরিসরে বিশ্বের নানা স্থানে। মহালয় থেকে শুরু করে মহাষষ্ঠিতে দেবীর বোধন অর্থাত্ মণ্ডপে মণ্ডপে নানা রূপে, ভঙ্গিমায় এবং বিভিন্ন বর্ণ-আবরণ-আভরণ-অংলকারে সজ্জিত দেবীর মূর্তি বেদীতে (Altar) স্থাপন করা হয়। অবশ্য এই বেদীতে চার সন্তানসহ মহিষাসুর ও আনুষঙ্গিক সবকিছু সংযোজিত হয়ে থাকে। সাধারণত চারদিন ধরে পূজা চলে। মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী পেরিয়ে বিজয়া দশমীতে এই আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই পর্বের আনুষ্ঠানিকতার প্রাক্কালে পুরোহিতের মন্ত্র, শঙ্খধ্বনি ও ঢাক-ঢোলের ছন্দময় আওয়াজ, ধূপের সুবাসিত গন্ধ, বিভিন্ন আঙ্গিকে আবর্তিত হয়ে বাঙালি মনকে উতলা করে ফেলে এবং ঘরে বসে থাকতে চায় না আর মন। ছুটে চলে যায় মণ্ডপের দিকে। এদিকে ফলমূল, ভোগ ও প্রসাদসহ সন্দেশ, লাড্ডু, নাড়ু, মোয়া ইত্যাদি বিতরণ করা হয়ে থাকে। কুমারী পূজার দিন থেকে দশমীতে দেবী বিসর্জনের অব্যবহিত পর গুরুজনকে প্রণাম, সমবয়সীদের আলিঙ্গনে ও ছোটদের আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ণ মিলন মেলা। বসন্তকাল থেকে শরত্কালে এই পূজা কবে থেকে শুরু হয়েছে তা বলা সুকঠিন। তবে অনেকে বলে থাকেন, নবাব সিরাজের পতনের পর বাসন্তী থেকে রূপান্তরপূর্বক শারদীয় পূজার আগমন ঘটে ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, একটি অসমর্থিত খবরে জানা যায় যে, মুর্শিদাবাদ থেকে অবসরপ্রাপ্ত একজন অশীতিপর ব্রাহ্মণরাজ নায়েব অতীত কর্মের অনুশোচনায় দুর্গাকে পূজা দিতে মনস্থ করেন এবং সেই সূত্র ধরে তত্কালীন রাজশাহীর একটি নদীর তীরে প্রথম শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এতদ্ব্যতীত হাজার হাজার বছর পূর্বে পাঞ্জাবের হরপ্পা ও সিন্ধুর মহেঞ্জোদারকে ঘিরে নারী শক্তি পূজার প্রচলন ছিল। অবশ্য এর সপক্ষে দুই নগরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অসংখ্য নারী মূর্তি অর্থাত্ মৃন্ময়ী দেবীমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে নারীমূর্তির পিছনের শানে নুযুল যদি তলিয়ে দেখি, তাহলে প্রতীয়মান হয়, নারী শক্তির পূজা উদ্ভব হয় মুখ্যত প্রাচীনকালে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার থেকে। অবশ্য নারী শক্তির পূজা হিসেবে একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছে এ মহান দুর্গা। আর দুর্গা নামটি চণ্ডিরই নামবিশেষ। ঋগ্বেদে দুর্গা অরুষী (অরুণ বর্ণ) নামে পরিচিত। তবে ঋগ্বেদে এই পূজার তেমন কোনকিছু উল্লেখ্য নেই, কেবল স্তব আছে। এ কথা মনে করার যথেষ্ট হেতু আছে যে, মহান দেবীর পূজা বেদের সময়কাল থেকেই সাধারণ গণমানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ঋগ্বেদে উষার উপাসনা থেকে প্রকারান্তরে দুর্গাপূজার উত্পত্তি হয়েছিল বলে অনেকে মনে করে থাকেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, পার্বতী বা দুর্গা গুহার মধ্যে থাকলে কালী, গুহামুখে অর্থাত্ গুহার বাইরে তিনি গৌরীরূপে আবির্ভূত হন। সেহেতু তাঁর আর একটি নাম দ্বারবাসিনী এবং সেই সূত্র ধরে দুর্গাকে গৌরীরূপে সনাতনীরা পূজা ও অর্চনা করে থাকেন। এ কথা মনে করা ঠিক হবে না, আমরা যে মহীষাসুর বধ করার শেষ মূর্তি দেখি এবং এর আবর্তে পূজা করে কেবল এই এক মুহূর্তে দুর্গা অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতীকীরূপে অসুরকে বধ করেননি। তাঁকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা-ক্লেশ ও সময় নিয়ে অসূরকে হত্যা করতে হয়েছিলো। আর এই পর্যায়ে আনতে দুর্গাকে কম ঝুঁকি পোহাতে হয়নি। এক্ষেত্রে আমরা সূক্ষ্মভাবে যদি চিন্তা করি, তাহলে প্রতীয়মান হয় আমাদের ষড়রিপু বেশি শত্রু সবসময়ে ধোঁকা দিয়ে থাকে এবং অন্যায় ও অসত্যের দিকে ঠেলে দিতে থাকে। আর এক্ষেত্রে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করা সহজসাধ্য নয়, বারংবার আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হলেই কেবল অসুরসদৃশ ষড়রিপুকে পরাজিত করা সম্ভব। পরিশেষে বলতে চাই যে, অসুর তথা অপশক্তির ভেতর ও বাইরের জায়গায় অবস্থান নিয়ে অন্যায় ও অবিচারের পথ ধরে মনুষ্যকুলকে অতিষ্ঠ করে তুলে। বাইরের চিহ্নিত শত্রু হতে রক্ষা পাওয়া গেলেও, ভেতরের শত্রু থেকে মুক্তি পাওয়া সহজসাধ্য নয়। সেহেতু পুরান ও চণ্ডী ধর্মগ্রন্থের বর্ণনানুসারে বলা হয় যে, মানুষের ভিতরের অসুর অপশক্তির বিনাশ করার শুভশক্তির নামই হচ্ছে আদ্যশক্তি মহামায়া, যা চির শান্তির ও চির মঙ্গলের বারতা বয়ে আনে। তিনিই সর্বেসর্বা দুর্গা যিনি চেতনের চেতনা, বুদ্ধিমানের বুদ্ধি, বুভুক্ষার ক্ষুধা, দেহের কমনীয়তা, শ্রমবৃদ্ধি, পবিত্রতা, স্মৃতি, দয়া, মায়া, সন্তোষ, হাসি, কান্না ইত্যাদি বলতে গেলে সবই। তিনি মায়ের মতো করুণাময়ী এবং সৃষ্টিকর্ত্রী। এটি বুঝাতে ও তুলে ধরার জন্য নারীমূর্তি কল্পনা করা হয় মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তিনি পুরুষ বা নারী কিছুই নহেন। তবে লীলা প্রকাশ করিবার জন্য এবং দুষ্টের দমনের জন্য কখনও পুরুষ দেহ ধারণ করেন, কখনও বা নারীর বেশ ধারণ করেন। তাই বলা হয়েছে-নমঃ নমঃ মা দুর্গা নমঃ নারায়ণী; কখনও বা পুরুষ হও কখনও বা রমণী। মূলত দশভুজা দুর্গা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতীক। আসলে প্রত্যেকটি ছোট-বড় ধর্মে আদি সত্য (Stem Truth) একই। কেননা মৌলিকতার দিক দিয়ে একই ঝরনা ধারা। কিন্তু বর্তমানে আমরা তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। প্রায় ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে অসত্য, অপসংস্কৃতি, প্রথা ও আচারভিত্তিক। অথচ আমরা চোখ বুঁজে একবার যদি চিন্তা করি, তাহলে অনুধাবন করতে পারবো যে সব ধর্মের মূল্যবোধ ও আদর্শ একই এবং সমরূপ। আর সেই অনুযায়ী চললে আজ সারা বিশ্বের সাড়ে সাতশ কোটি লোকের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, মারামারি কমে এসে শান্তির হাওয়া বইতে থাকবে এবং বিশ্বজনীন নাগরিক হয়ে একে অন্যের সুখ-দুঃখের ভাগীদারপূর্বক একই সূত্রে আবদ্ধ হয়ে পড়বো। তাই এর ফলশ্রুতিতে কারও প্রতি অন্যায় করার মানসিকতা থাকবে না। তখন সেই আলোকে সবধরনের অসুর কোণঠাসা হয়ে পড়বে। আর আমরা সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি। লেখক:গবেষক