গার্মেন্টস শিল্প এবং মজুরি

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৪
গার্মেন্টসশ্রমিকদের বেতন ৩ হাজার টাকা থেকে ২০% বাড়িয়ে ৩ হাজার ৬শ’ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক পক্ষ। এই তিন হাজার ছয় শ টাকার মধ্যে মূল বেতন ধরা হয়েছে ২৪০০ টাকা, বাড়িভাড়া ৯৬০ টাকা এবং চিকিত্সাভাতা ২৪০ টাকা। মালিকদের এই সিদ্ধান্ত শ্রমিকেরা মানেনি। তাই তাদের আন্দোলন। শ্রমিকদের এই আন্দোলন নিরসন করতে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে সচিবালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে সরকারের একজন মন্ত্রী শ্রমিকদের পক্ষে বেশ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছেন বলে জানা যায়। তাই অনেকেই আশা করছেন গার্মেন্টসশ্রমিকদের মজুরি বিষয়ক বিষয়টির একটি সুষ্ঠু সমাধান করা হবে। বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গামেন্টসশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। অর্থনীতিতে মজুরি নির্ধারণ পদ্ধতি জীবন ধারণ তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রমিক ও তার পরিবারের জীবন ধারণের পক্ষে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় সেই পরিমাণ অর্থই শ্রমিকের মজুরি হিসাবে নির্ধারিত হবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের মজুরি শ্রমিকের জীবন ধারণ স্তরের সমান হতে হবে। বর্তমান বাজারদরে নির্ধারিত মজুরি যদি হয় ৩ হাজার ৬শ টাকা, তা কি জীবন ধারণ স্তরের বর্তমান সময় উপযোগী? বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের গঠিত বেতন কমিশন সারা দেশব্যাপী জীবন ধারণের বাজারদর পরিসংখ্যান করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছেন। সরকারি কর্মীদের জন্য সর্বনিম্ন মূল বেতন ধরা হয়েছে ৪১০০ টাকা আর গামেন্টসশ্রমিকের বেতন ধরা হচ্ছে ২৪০০ টাকা। এই মূল বেতন কাঠামোটির পার্থক্য সরকারের কি দৃষ্টিগোচর হয় না? তাছাড়া সরকারি কর্মীদের প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট প্রথা রয়েছে। সরকারি যে কোনো স্তরের একজন কর্মীর চাইতে বেশি সময় শ্রম বিনিয়োগ করে গার্মেন্টসশ্রমিক। তারপরও কেন একজন গার্মেন্টসশ্রমিকের বেতন সরকারি কর্মীর চাইতে এত বেশি পার্থক্য থাকবে? গার্মেন্টসশ্রমিকের মজুরি কাঠোমার জটিলতা সরকারি বেতন কমিশনের মাধ্যমেই সুরাহা করা যায়। সরকারি কর্মীরা এবং গামেন্টসশ্রমিকেরা একই দেশের একই অর্থনৈতিক ধারায় বসবাস করে। তাই সরকারের উচ্চমহলের গার্মেন্টসশ্রমিকদের মজুরি সুরাহা বিষয়ের বৈঠক করা দেখে রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার পঙক্তি মনে পড়লো—“বসিল সবে চশমা চোখে আঁটি” “ফুরিয়ে গেল উনিশ-পিপে নস্যি”। তারপরও কিন্তু এই বিশেষজ্ঞরা জুতা আবিষ্কারের ফরমুলা বের করতে পারেনি। ঠিক তেমনিভাবে এদেশের গার্মেন্টস শিল্প প্রচলন হওয়ার পর থেকে শ্রমিকের বেতন বৈষম্য নিরসনে দফায় দফায় শুধু বৈঠক হয়েছে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনো এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্থায়ী ও সর্বজনীন বেতন কাঠামো তৈরি হয়নি। দেশের জিডিপি বেড়েছে। বেড়েছে দেশের সামগ্রিক মোট আয় যার ফলে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০ ডলারে যা মাসিক হিসাবে মাথাপিছু আয় হয় ৬ হাজার ৯শ টাকা। এই সামগ্রিক আয় বাড়ার মূল অবদান এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের। দেশের শতকরা আশি ভাগ আয় হয় গামেন্টস শিল্প থেকে। দেশের গামেন্টস শিল্পের মেশিনারিজসহ সকল কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশের শ্রম এই আমদানিকৃত কাঁচামাল পণ্যে রূপান্তরিত করে। এই পণ্য বিদেশে রফতানি করে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে দেশ। তাহলে এই শ্রমের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে কেন এত অনীহা? গামেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি এতটাই অপ্রতুল যে এই মজুরি প্রাপ্তির মাধ্যমে বর্তমান বাজারদরে একটি পরিবারের জীবন ধারণ দুঃসাধ্য। আর যখনই শ্রমিকেরা এই দুঃসাধ্য জীবন ধারণ থেকে পরিত্রাণ পেতে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে, তখনই বলা হয়—একটি মহল ষড়যন্ত্র করে এ দেশের গামেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে, তাই তারা গামেন্টস শিল্পে অরাজকতা সৃষ্টি করছে। এ ধরনের মন্তব্য সাধারণ শ্রমিকদের মনে এক ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করে, তারা ভাবে, এই আন্দোলন করলে তারা যা পাচ্ছে তা থেকেও বঞ্চিত হবে। এই ভাবেই এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের ব্লাক মেইলিং করে স্বল্প বেতনে কাজ করানো হচ্ছে। এই ব্লাক মেইলিং পদ্ধতিতে শ্রম শোষণ প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া উচিত। যদি কোনোদিন এই শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে তা কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবির আন্দোলনে হবে না। তা হবে শ্রমিকদের স্বল্প মজুরির জন্য। এই শিল্পের মূল ভিত্তি হলো শ্রম। আর একজন শ্রমিক এই শ্রম বিনিয়োগ করতে পারে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম চাহিদা পূরণের মাধ্যমে। তাদের জীবন ধারণ দুঃসাধ্য হলে তারা কি পারবে ভবিষ্যতে শ্রম বিনিয়োগ করতে? গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির অন্যতম উপাদান। এই শিল্পের মূল উপাদান শ্রমকে অবজ্ঞা করে কোনোদিনই একে টিকিয়ে রাখা যাবে না। রাজশাহী