উচিত-অনুচিত

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৪
বিএনপির ধারণা দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন কখনোই নিরপেক্ষ হতে পারে না। ধারণাটি একেবারে অমূলক তা কিন্তু বলা যাবে না। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে নিরপেক্ষতার এমন নজির আজো সৃষ্টি হয়নি, যেখানে শাসকদল পরাজিত হয়ে অন্যের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করেছে। তাই প্রশ্ন জাগে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে আওয়ামী লীগ যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে তা পালনে কতটা সক্ষম হবে? পারবে কি প্রধান বিরোধী দলকে আস্থার বলয়ে আবদ্ধ করতে? ইতোমধ্যেই স্থানীয় সরকার পর্যায়ের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ করলেও তাদের ভয় কাটছে না। আসলে আমাদের সংকটের স্থান হলো আস্থায়। আস্থা অর্জনে আমরা কেউই আস্থাশীল নই। বরং অনাস্থার বাতাবরণ তৈরিতে আমরা সিদ্ধহস্ত। নির্বাচনের আগে ওয়াদা করার ক্ষেত্রে যতটা উচ্চকণ্ঠ, নির্বাচনের পরে ওয়াদা পালনে ততটাই নিশ্চুপ। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সবাই দুরারোগ্য স্মৃতিভ্রম রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়। আর পরাজিতরা বিরোধী দল হিসেবে জনগণের বন্ধু সেজে সরকারের সকল কাজের সমালোচনায় মুখর হয়। এটাই আমাদের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এর থেকে উত্তরণের পথ নেই। আমরা স্ব-জ্ঞানেই সে পথ মাড়াতে চাই না, যে পথে জনগণের কল্যাণ হয়। বস্তুত আমরা স্ব-স্বার্থেই অন্ধ। বর্তমান সময়ে আমরা সকলেই গণতন্ত্রের সেবক। যদি জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার পদ্ধতির নাম গণতন্ত্র হয়, তবে সেই পদ্ধতিতে উত্তরণ ও অনুসরণে আমাদের কোনো ত্যাগের কমতি নেই। অহরহই জীবন উত্সর্গ করছেন দেশের অকুতোভয় গণতন্ত্রের সেবকেরা। গণতন্ত্রের জন্য এত ত্যাগ পৃথিবীর আর কোনো দেশ করেছে কিনা, তা আমার জানা নেই। কিন্তু তারপরও অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় গণতন্ত্র এদেশে দৃশ্যত জনগণের নয়। শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের কাছে গণতন্ত্র অসহায়, পঙ্গু। তা হোক না! তাতে গণতন্ত্রের কী এসে যায়? গণতন্ত্র তো আর নিজে গণতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করবে না, তবে তার দায় কিসের? তাই স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন গণতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক সব শাসকের শাসন, দুঃশাসন উদারচিত্ত গণতন্ত্রকামী জনগণ সর্বংসহার মতো মেনে নিয়েছে। জনগণ যদি রাজনীতিকের স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাসকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে পারে, তবে রাজনৈতিক দলগুলো কেন ক্ষমতার লোভ সংবরণ করে গণতন্ত্রের কল্যাণকামী হতে পারে না? আর সভ্যতার শুভ্র পোশাকের অন্তরালে কেনই বা কুিসত হায়েনার হিংস্রতা? কেন বাংলাদেশের দু’টি বৃহত্ দলের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে এত জটিলতা? যে রক্তক্ষয়ের আশঙ্কায় গোটা জাতি আজ ভীত সন্ত্রস্ত, তা থেকে মুক্তি পেতে হবে। আর এ দায়িত্ব রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপরই বর্তায়। আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে পরবর্তী দুই টার্ম নির্বাচনের যে অপশন রাখা হয়েছে, তা আওয়ামী লীগের মেনে নেওয়া উচিত। এর ফলে এবারের নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়ে বিরোধী দলে অবস্থান নেবে, পরবর্তী টার্মে নির্বাচিত হয়ে সরকারে আসীন হলে বিরোধীদের তত্ত্বাবধায়কের দাবি আর ধোপে টিকবে না। অন্যদিকে বিএনপির উচিত পার্লামেন্টে অবলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিকে পরিহার করে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। ইতোমধ্যেই স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফলের উদাহরণ টেনে বিএনপি সর্বত্র বলে বেড়াচ্ছে যে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তারা বিজয়ী হবে। তাদের ধারণা সত্য হলে বিএনপিকে আর পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে দিতে হবে না। বহমান এ রাজনীতির সুযোগ দু’টি দলই গ্রহণ করতে পারে, আবার নাও পারে। সিদ্ধান্তটি একান্তই তাদের বিষয়। তবে যে সিদ্ধান্ত জনগণের দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা বাড়ায় তা অবশ্যই গ্রহণ করা অনুচিত। মনে রাখতে হবে, দেশ এবং জাতির অস্তিত্বের ওপরই আমাদের ভবিষ্যত্। ঝিনাইদহ