১৩ দফা দাবির সমর্থনে গত ৫ মে রাজধানী ঢাকা ঘেরাও করে দেশে- বিদেশে ব্যাপক আলোচনায় আসা সংগঠন হেফাজতে ইসলামের এখন খুবই দুঃসময়। ৫ মে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচির নামে মতিঝিল, যাত্রাবাড়ি ও কাঁচপুর এলাকায় নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে এখনও পর্যন্ত সরকারের তোপের মুখে রয়েছে সংগঠনটি। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার এড়াতে এখনও গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা। সংগঠনের আমীর আল্লামা শাহ আহমেদ শফী অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে খুব একটা জনসম্মুখে আসছেন না। আমীরের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সংগঠনের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী জামিনে মুক্ত থাকলেও অসুস্থতার কারণে তার চলাফেরাও অনেকটাই সীমিত। হেফাজতের মধ্যে ছয়টি রাজনৈতিক দল থাকলেও তাদের বেশিরভাগ নেতা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হিসাব কিতাব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ১৮ দলীয় জোটের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে দু’জন শীর্ষ নেতাকে সমপ্রতি গঠিত হেফাজতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ও সমপ্রসারিত মজলিশে সুরা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে দলের নেতারা জানিয়েছেন।
এরকম নানা টানাপোড়েনের মধ্যে গত সোমবার চট্টগ্রামে নায়েবে আমীর মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর মাদ্রাসায় রহস্যজনক বিস্ফোরণের ঘটনা হেফাজতের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হেফাজতের সাহিত্য ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুফতি হারুন বিন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করে খুনের মামলাসহ তিনটি মামলা করেছে। নগরীর লালখান বাজার এলাকায় মুফতি ইজহারের মাদ্রাসাটি পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে। মুফতি হারুনকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলেও হেফাজতের দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিত মুফতি ইজহার পলাতক রয়েছেন। তার সন্ধানে পুলিশ নগরীর কয়েকটি মাদ্রাসায় তল্লাশি চালিয়েছে। পুলিশের অব্যাহত অভিযানের কারণে মাদ্রাসা ছাত্র ও শিক্ষকরা গ্রেফতার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে হেফাজত নেতারা অভিযোগ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, ছাত্ররা বর্তমানে মাদ্রাসার ভেতরেই অবস্থান করছেন। খুব প্রয়োজন না হলে কেউ বাইরে আসছেন না।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে মে পর্যন্ত আলোচনার তুঙ্গে থাকা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম গত ৫ মাস ধরে একরকম পর্দার আড়ালেই অবস্থান করছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতের উদ্যোগে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও ওই সম্মেলন ছিল অনেকটাই ঘরোয়া। সম্মেলনে প্রায় দুই হাজার আলেম ওলামা অংশ নেন বলে হেফাজতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। সম্মেলনে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করার পাশাপাশি মজলিশে সুরা কমিটি সমপ্রসারণ করে হেফাজত। তবে সংগঠনের দুই প্রভাবশালী নেতা মাওলানা মইনুদ্দীন রুহী এবং মুফতি ফয়জুল্লাহকে কোনো কমিটিতে না রাখায় হেফাজতের অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে এ দুই নেতাকে ঘোষিত কমিটিগুলোতে রাখা হয়নি বলে হেফাজতের একটি অংশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তবে হেফাজতের আমীর আল্লামা শফী এ অভিযোগ অস্বীকার করে একটি বিবৃতি দেন। জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন থেকে সরকার ১৩ দফা মেনে না নিলে এবং কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ বন্ধ না করলে আগামী জানুয়ারি মাসে সচিবালয় ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচির কথা ঘোষণা করা হয়।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রস্তাবিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন না করার দাবিতে গত মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দেয় হেফাজতে ইসলাম। তবে ওই কর্মসূচি সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সমপ্রতি বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাই কমিশনার চট্টগ্রামে এসে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও নেজামে ইসলাম পার্টির একাংশের সভাপতি মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। নগরীর লালখান বাজার এলাকায় মুফতি ইজহার পরিচালিত জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক ঘিরে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়। হেফাজত নেতারা জানান, বৈঠকে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার কার্যক্রম, নারীর প্রতি হেফাজতে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা বিষয়ে অস্ট্রেলীয় দূতকে ইতিবাচক ধারণা দেয়া হয়েছে।
তবে অস্ট্রেলীয় দূতের সাথে বৈঠকের আমেজ মিলিয়ে যেতে না যেতেই গত ৭ অক্টোবর মুফতি ইজহারের ওই মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে বিস্ফোরণের ঘটনায় হেফাজতের ইমেজ আবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নগরীর খুলশি থানায় মুফতি ইজহার ও হারুন ইজহারের বিরুদ্ধে দুইজনকে হত্যার দায়ে একটি খুনের মামলা এবং বিস্ফোরক আইন ও এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনে আরো দু’টি মামলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর মুফতি ইজহার ও হারুন ইজহারকে দ্রুত গ্রেফতার করার নির্দেশ দিলে পুলিশ পরদিন হেফাজতের প্রধান কার্যালয় হাটহাজারী মাদ্রাসার অনতিদূরে একটি গ্রাম থেকে মুফতি হারুন ইজহারকে এক সহযোগীসহ গ্রেফতার করে। মুফতি হারুন বর্তমানে ১০ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
