গরুর হাটে বাপ-বেটা

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৪৬
কোরবানির ঈদের আনন্দ মানেই হাটে গিয়ে গরু কেনা। ছোটবেলা বাবা-চাচা আর ভাইদের সাথে গরু কেনার স্মৃতি আজীবন অমলিন থাকে। আর দশটা মানুষের মতো আমাদের শোবিজের তারকাদেরও রয়েছে এমন কিছু মধুর স্মৃতি। অনেকে এখনও বাবাদের সাথে গিয়ে গরু কিনে আনেন। চার জোড়া বাবা-ছেলের কোরবানির গরু কেনার গল্প নিয়ে বিশেষ এই ফিচারটি লিখেছেন রুদ্র মাহফুজ রাজ্জাক-সম্রাট রাজ্জাক ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের নিয়ে গরুর হাটে যান। প্রথম প্রথম উত্তরার আবদুল্লাহপুর, গাবতলীসহ দূরের হাটগুলোতে গেলেও এখন বনানী ও কুড়িল বিশ্বরোড থেকেই কেনা হয়। গরু কিনতে গেলে প্রতিবছরই কোনো না কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় নায়ক রাজের পরিবারকে। বছর দশেক আগের কথা। রাজ্জাক সেবার ১৫ লাখ টাকা খরচ করে নতুন একটি গাড়ি কিনেছেন। গাড়িতে করেই ছেলেদের নিয়ে যাচ্ছেন গরুর হাটে। হাটের একদম কাছাকাছি যেতেই হঠাত্ দড়ি খোলা একটি বড় গরু এসে সামনে থেকে এমন জোরে গুঁতা মারল যে গাড়ির সামনের অবস্থা বাংলা পাঁচ হয়ে গেল। শখের গাড়ির এমন দুরবস্থা দেখেও কিছুই করার ছিল না। মুখটা কালো করেই সেবার ঈদটা পার করলেন। এ ছাড়া প্রতিবছর হাটের দালালরা এই পরিবারকে বারবারই ঠকায়। এই তো বছর দুই-তিন আগের কথা। যে গরুর দাম মাত্র ৫০ হাজার টাকা হবে, সেই গরুর দাম কিনা তাদের দেখে এক লাখ ২০ হাজার টাকা রাখল! বিস্ময় প্রকাশ করতেই দালাল অবাক হয়ে বলেন, ‘আপনারা সবাই এত টাকা রোজগার করেন, আর বছর শেষে এই ক’টা টাকা খরচ করবেন না!’ তাই সম্রাট বলেন, ‘এবারে অনেক সাবধান হয়ে গরু কিনব।’ এখনও কোরবানির হাটে যাননি রাজ্জাক। গেলে বাপ্পা-সম্রাটের কেউ না কেউ থাকবেনই বলে জানালেন। আলী যাকের-ইরেশ যাকের হাটে গিয়ে গরু কেনার অভিজ্ঞতা ইরেশের প্রায় নেই বললেই চলে। আর খুব ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গরু কিনতে গিয়েছিল কি-না, সেটাও ভালোভাবে মনে নেই। তবে ঈদের দিনগুলো বরাবর বাবার সান্নিধ্যেই কেটেছে। ইরেশ বলেন, ‘আমরা কোরবানি দিই সাধারণত ঢাকার বাইরে। গাজীপুরে আমাদের একটি খামারবাড়ি আছে। সেখানেও কেটেছে আমাদের বেশ কিছু ঈদ। ১৯৯৭ সালের দিকে এসে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া শুরু করি। সেই থেকে আমাদের ঈদ কাটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আমরা যখন গাজীপুরে ছিলাম, সে সময় মাত্র কলেজে পা দিয়েছি, সেই বয়সে একবার গরুর হাটে গিয়েছিলাম। সেই গরুর হাটের স্মৃতি এখন অনেকটাই গৌন।’ আলী যাকের বলেন, ‘এ বছর আমরা ঈদ করব ঢাকায়। ঈদে আমাদের বাপ-বেটার বরাবরই ভালো কাটে। এবারও হয়তো অনেক মজা হবে, বাপ-বেটা মিলে বেড়াতেও চলে যেতে পারি কোথাও।’ ফেরদৌস ওয়াহিদ-হাবিব ওয়াহিদ বছর সাত ধরে বাপ-বেটা আলাদা কোরবানি দেন। হাবিব এখন বড় হয়েছে, তার মধ্যে দায়িত্বশীল ভাবটাও এসেছে। তিনি এখন আলাদাভাবে তার দায়িত্ব পালন করেন। এমনিতেই কোরবানির প্রতি হাবিবের রয়েছে বেশ আগ্রহ ও শ্রদ্ধাবোধ। কোরবানির মতো একটি মহান কাজে তার মনোযোগ ও আকর্ষণ উল্লেখ করার মতো। কোরবানি দেন একেবারে মন থেকে। এতে থাকে না লোক দেখানোর কোনো ধরনের পরিকল্পনা। বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘বছর সাত ধরে সে আলাদা কোরবানি দিলেও আমরা একত্রে কোরবানি দিয়েছি ২০ বছর। একসঙ্গে হাটে গরুও কিনতে গিয়েছি বহুবার। আমরা হাটে যেতাম মোটরসাইকেল নিয়ে। লাল রঙের গরুর প্রতি হাবিবের বিশেষ টান। হাবিব যখন বেশ ছোট, তখন আমার সঙ্গে এক গরুর হাটে গিয়ে গরুর গলায় মালা দেখে খুব অবাক হয়। সে আমাকে মালা দেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করে। আমি বলি, গরুকে উত্সর্গ করা হবে বলে মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। উত্সর্গের জন্যও সাজের প্রয়োজন আছে। মিরপুরের এক গরুর বাজারে হাবিবকে নিয়ে একবার মজার এক কাণ্ড হয়েছিল। গরুর রশি হাবিবের হাত থেকে খুলে গিয়েছিল। গরুও ছুট দিতে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আশপাশের লোকজন ধরে ফেলে গরুটিকে। তবে আমাদের দু’জনার ঈদের প্রস্তুতি বেশ ভালোই। এখনও কোরবানির পশু কেনা হয়নি। দেখি, দেখেশুনে একদিন হাটে গিয়ে হাজির হব।’ কাজী হায়াত্-কাজী মারুফ অনেক ছোট বয়স থেকেই মারুফ বাবা কাজী হায়াতের সঙ্গে কোরবানির হাটে যাওয়া শুরু করেন। প্রতিবছরই যান। মারুফের মতে, গরু কেনার দিন থেকেই ঈদের আনন্দটা শুরু হয়। গরু নিয়ে বাড়ি এলেই যেন উত্সব লেগে যায়। গরুকে কে খাওয়াবে, কী খাওয়াবে—এসব নিয়ে বোনের সঙ্গে মারুফের প্রতিযোগিতা চলে। কাজী হায়াতও ছেলেমেয়ের এ আনন্দে শরিক হন। আগে সাধারণত গাবতলীর হাট থেকে গরু কেনা হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আগারগাঁও, আবার কখনও বনানী হাট থেকে গরু কেনেন তারা। গরু কিনতে গিয়ে অনেক মজার ঘটনাও ঘটেছে। একবার গরুর দাম পরিশোধ করার পরও ব্যবসায়ী আরও দশ হাজার টাকা দাবি করে বসেন। কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা অনেক উদার মানুষ। মনটাও মহত্। তাই এই সামান্য টাকা দাবি করছি।’ সবাই তো অবাক! মারুফ জিজ্ঞেস করেন, ‘কিভাবে জানলেন আমাদের মন মহত্?’ লোকটি বলেন, ‘কেন, সিনেমায় তো সেটাই দেখি।’