ঈদ মানেই আনন্দ। আর এই আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হয় যখন ঈদের দিন বা ঈদের পরের দিন কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে কোরবানির মাংস, নানা খাদ্য যেমন জর্দা, ফিরনি, সেমাই, হালুয়া ইত্যাদি আহার করেও অসুস্থ হতে পারেন। আর কোরবানির ঈদের সময় অসুস্থতা এবং কীভাবে আপনারা সুস্থ থাকতে পারেন এই নিয়ে আজকের এই লেখা। এখন দেখা যাক কোরবানির ঈদে কী কী ধরনের অসুস্থতা আমাদের হতে পারে। সাধারণত কোরবানির ঈদের সময় অতিরিক্ত আহারের ফলে হজমে সমস্যা, ফুড পয়জনিং, অ্যালার্জি, হার্ট বার্ন, রক্তচাপের তারতম্য হতে পারে। এক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে এসবের বর্ণনা ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন চর্মরোগ ও অ্যালার্জি এবং যৌন সমস্যা বিশেষজ্ঞ ডা. মোড়ল নজরুল ইসলাম
হজমে সমস্যা
হজমে সমস্যা বা ইনডাইজেশন সাধারণত অতিরিক্ত আহারের কারণে হতে পারে। তাই কোরবানির ঈদের সময় যাদের হজমের সমস্যা আছে তাদের পরিমাণ মতো রান্না করা মাংস ও অন্যান্য খাবার আহার করা উচিত। এ ছাড়া যাদের অতিরিক্ত আহার বা স্বাভাবিক কারণে হজমে সমস্যা বা বদহজম হয়, তাদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিত্সা নিতে হবে। যেমন—ঢেঁকুর উঠলে বা পেটে গ্যাস হলে অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হবে। এ ছাড়া অধিক পানি পান এবং হজমে সহায়ক কিছু ওষুধ বা ডাইজেসিটভ মেডিসিন সেবনে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
ফুড পয়জনিং
সাধারণত অতিভোজন, বাইরের খাবার, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি না করা খাবার খাওয়া এবং জীবাণুযুক্ত খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার অথবা পঁচা-বাসি খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে। ফুড পয়জনিং হলে আক্রান্ত ব্যক্তি বা শিশুর পেটে ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা, সঙ্গে জ্বরও হতে পারে। ফুড পয়জনিং সমস্যার চিকিত্সা ও করণীয় হচ্ছে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিত্সা দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ডায়রিয়া ও ফুড পয়জনিংয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না রোগীরা। ফুড পয়জনিংয়ের রোগীদের সাধারণত পাতলা পায়খানা ও বমি হলে রোগীকে খাবার স্যালাইন খেতে দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোগীর অবস্থা অনুযায়ী জীবাণুনাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ সেবনের প্রয়োজন পড়ে। এক্ষেত্রে সিপ্রোফ্লকাসিন দেওয়া যেতে পারে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে এজিথ্রোমাইসিন দিনে ১ বার তিন দিন দেওয়া যায়। যেহেতু ফুড পয়জনিং জীবাণু দ্বারা সংক্রমতি হয় তাই অ্যান্টিবায়োটিক ভালো কাজ করে। তবে চিকিত্সকের পরামর্শ ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বাঞ্ছনীয় নয়। এ ছাড়া জ্বর থাকলে শুধু প্যারাসিটামল সেবন করা যায়। প্যারাসিটামল ভরাপেটে খেতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোনো ভালো কোম্পানির প্যারাসিটামল বয়স অনুযায়ী দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে ফুড পয়জনিংয়ের ক্ষেত্রে অ্যান্টিস্পাসমোটিক জাতীয় ওষুধ সেবন করা যাবে না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। আর যদি পাতলা পায়খানা, বমি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায় তবে অবশ্যই চিকিত্সকের পরামর্শে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। শিশুরা যাতে যত্রতত্র ফার্স্টফুড, সফট ডিংকস, আইসক্রিম না খায় তার জন্য অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।
অ্যালার্জি
অ্যালার্জি শব্দটির সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত। খাদ্যে অ্যালার্জি, ডাস্ট বা ধুলা-ময়লা থেকে অ্যালার্জি, রং থেকে অ্যালার্জি, নতুন কাপড় থেকে অ্যালার্জি, কসমেটিক প্রসাধন সামগ্রী থেকে অ্যালার্জি; সফট ড্রিংস, ফাস্টফুড, টিনজাত ফুড, জুস থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। সাধারণত অ্যালার্জির কারণ জেনে চিকিত্সা নিলে অ্যালার্জি থেকে ভালো থাকা যায়। এ ছাড়া যাদের খাদ্যে অ্যালার্জি আছে তাদের ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, ডিম, বেগুন, চিংড়ি মাছ পরিহার করা ভালো। এ ছাড়া অনেক সময় সিনথেটিক কাপড় ও ব্যবহার্য প্রসাধন সামগ্রী, সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার, কেমিক্যাল থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। কারণ জেনে চিকিত্সা নেওয়া ভালো। এক্ষেত্রে যেকোনো অ্যান্টি-হিস্টামিনজাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। তবে অ্যালার্জির তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করলে এবং আক্রান্ত স্থান ফুলে লাল হয়ে গেলে বা চাকার মতো হলে এবং সাধারণ অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধে ভালো না হলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিত্সক রোগীর অবস্থা বুঝে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন অথবা ইনজেকশন দেবেন। তবে কোনো অবস্থাতেই চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের মারাত্মক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে শিশুদের অ্যালার্জি প্রতিরোধে সফট ড্রিংস, বোতলজাত জুস ও ফাস্টফুড খাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
হার্ট বার্ন
হার্ট বার্ন বা বুক জ্বালাপোড়া একটি জটিল সমস্যা। বিশেষ করে যাদের পেটের সমস্যার আছে তারা যদি অধিক মসলাযুক্ত বা স্পাইসি খাবার আহার করেন, তাদের বুক জ্বালাপোড়া বা আলসার আরও বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অনেক সময় অতিরিক্ত আহারের ফলে পাকস্থলীর খাবার উপরের দিকে উঠে বুকে ব্যথা হতে পারে। যাকে ডাক্তারী ভাষায় বলা হয় হার্ট বার্ন। অনেকে এ ধরনের বুকের ব্যথা হার্টের ব্যথা মনে করেন। মনে রাখতে হবে হার্ট অ্যাটাকজনিত বুকে ব্যথা হলে বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা, শরীরে ঘাম, অস্থিরতা থাকবে। আর হার্ট বার্ন বা বুকজ্বালা পোড়াজনিত বুকে ব্যথার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই এবং অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ সেবনে উপকার পাওয়া যায়। এরপরও বিস্তারিত জানতে হলে কোনো মেডিসিন ও হূদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা
কোরবানির সময় অতিরিক্ত রেডমিট বা লাল মাংস আহারে রক্তচাপ বাড়তে পারে বা যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের রক্তচাপ আরও বাড়তে পারে। তাই এ সময় পরিমিত আহার বাঞ্ছনীয়।
এ ছাড়া যেকোনো ধরনের গুরুতর স্বাস্থ্য-সমস্যায় নিকটস্থ চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া যাদের গরুর মাংস খেলে অ্যালার্জি হয় তাদের সতর্কতার সঙ্গে মাংস আহার করা উচিত।
