তথ্যটা ছিল নিশ্চিত। সে মোতাবেক অভিযান। কিন্তু অভিযানে নেমে রিতিমত ভরকে যান। কারণ যে বাসায় অভিযান তার সাজগোজ আর দামী আসবাবপত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মিল ছিল না। এ অবস্থায় কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। শেষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। শেষটায় তাদের (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের) নির্দেশে এক প্রকার ‘ঝুঁকি’ নিয়ে অভিযান শুরু করেন। অবসান হয় সব আংশকার। সফল হন। গ্রেফতার করেন ‘মাদক বধূ’ নামে খ্যাত রুমা আকতারকে (৩০)। উদ্ধার করেন সাতশ’ বোতল (তার ও তার বাবার বাসা থেকে) ফেনসিডিল ও ফেনসিডিল বিক্রির দেড় লাখ টাকা। এ গল্পটা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ঢাকা অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো ঃ উপ-অঞ্চলেরর পরিদর্শক ফজলুল হক খানের।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি বিশেষ টিম বুধবার বিকালে রুমাকে অভিজাত এলাকা ৪৩/৩ সিদ্ধেশ্বরী রোডের চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে গ্রেফতার করে। ঘটনার পর থেকে পলাতক রযেছে রুমা আকতারের স্বামী আবু মনসুর, সত্ বাবা রমজান ও মা আনোযারা বেগম। এ ঘটনায় রমনা থানায় মামলা হয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রোঃ উপ-অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ লুত্ফর রহমান জানান, রাজধানীর ফেনসিডিল ব্যবসা এক সময় নিয়ন্ত্রণ করতো কমলাপুর টিটিপাড়া বস্তির মাদক সম্রাট নাসির। গ্রেফতার এড়াতে নাসির বর্তমানে সুইডেনে অবস্থান করছে। তার অনুপস্থিতিতে তার সহযোগীরা নগরীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ফেনসিডিল ব্যবসা করছে। এরই সুত্রধরে অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযান ব্যর্থ হলে তাকে পোহাতে হতো নানা ঝামেলা। এর আগেও তিনি একাধিকবার এ ধরনের বাসায় অভিযান চালাতে গিয়ে ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে এ কর্মকর্তা জানান।
অভিযান পরিচালনাকারী (সবুজবাগ সার্কেলের) পরির্দশক ফজলুল হক খান বলেন, গ্রেফতারকৃত রুমা, রুমার সত্ বাবা, তার মা তিনজনই মাদক সম্রাট নাসিরের সহযোগী। পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া রুমার আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল। তার (দ্বিতীয়) স্বামী আবু মনসুর। এক সময় আবু মনসুর বিদেশে ছিল। রুমাকে বিয়ে করে তিনিও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রুমাকে জিজ্ঞাসাবাদে জন্য গতকাল দুপুরে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আগামী রবিবার রিমান্ড শুনানী হবে বলে আশা করছি।
অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে কমলাপুর টিটিপাড়া সংলগ্ন গোপীবাগ এলাকা থেকে মানোয়ারা বেগম নামে (ছদ্মনাম) মহিলাকে ফেনসিডিল বিক্রির অভিযোগে আটক করা হয়েছিল। তার কাছ থেকে জানা যায়, ব্যাপক ধরপাকড়ের জন্য ফেনসিডিল ব্যবসায়িরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। এখন অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ফেনসিডিল ব্যবসায়িরা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মনোয়ারার দেয়া তথ্য মতে তিনি অনেকদিন ধরে রুমা আকতারকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। কিন্তু তার কথাবার্তা চাল-চলন দেখে কারোরই বোঝার উপায় নেই যে তিনি তার ‘সুন্দর বাসায় বসে চালাল অসুন্দর ব্যবসা।’
ফজলুল হক খান বলেন, রুমা আকতার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি নিজেও ফেনসিডিল সেবন করেন (তবে প্রতি রাতে এক বোতাল)। ফেনসিডিল চালান আসে যশোর ও কুমিল্লা সীমান্ত থেকে। তার বাসা থেকে ফেনসিডিল খুচরা বিক্রি হতো না। ২৫-৩০টি প্যাকেট করে শহরের বিভিন্ন স্পটে পাঠানো হতো। বর্তমানে এক বোতল ফেনসিডিল বিক্রি হয় এক হাজার টাকা করে। সামনে ঈদ এ কারণে বাসায় জমা রেখেছিলেন ফেনসিডিল।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল রুমা আকতারের বাবা-মা ফেনসিডিল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। রুমার কাছে তার বাবা-মার ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। অথচ তার বাবার বাসা ৬২ /৪ সিদ্ধেশ্বরী রোড ( রুমা আকতারের বাসার একশ’ গজের মধ্যে)। সেখানে থেকে উদ্ধার করা হয় পাঁচশ’ বোতল ফেনসিডিল।
অভিযানে অংশ নেয়া মতিঝিল সার্কেলের পরিদর্শক মাসুদুর রহমান বলেন, রুমা ও তার বাসা এমনভাবে সাজানো যাতে চোখ ঝুরিয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ২৫ হাজার টাকা। আর আশপাশের লোকজন তাদেরকে জানে রাজধানীর একাধিক অভিজাত মার্কেটে তাদের দোকান রয়েছে। গ্রেফতার হওয়ার পরপরই এলাকাবাসী বিষয়টি জানতে পারে।
