বিদ্যাসাগরের ছেলেবেলা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৬
‘বিদ্যাসাগর’ -কে তোমরা হয়তো কেউ জানো , কেউ জানো না । আজ থেকে প্রায় একশ বিশ বছর আগে তিনি ইহজগত্ ছেড়ে চলে গেছেন। আজকের পাঠ্যপুস্তক বা সাহিত্য-আলোচনায় তেমন করে বিদ্যাসাগরকে পাওয়া যায় না।‘বিদ্যাসাগর’ তাঁর নাম নয়-এটি তাঁর উপাধি। যথার্থই তিনি বিদ্যার সাগর এবং করুণার সিন্ধুও বটে। মেদেনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রাম।এ গ্রামের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী। ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন কলকাতায়।এই পরিবারে ছিল না শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ। অন্দরে মেয়েলি কলহ,অগ্রজে-অনুজে অবজ্ঞা, অভাব-অনটন—এরই মধ্যে জন্ম নিলেন একটি ‘এঁড়ে বাছুর’(পিতামহের পরিহাস সূচক সম্বোধন)। পিতামহের পরিহাস মিথ্যে হয় নি, সত্যিই তিনি এঁড়ে বাছুরের মতো একগুঁয়ে স্বভাবের ছিলেন। এই জেদী মনোভাব তাঁকে একসময় স্থির-প্রতিজ্ঞ এবং সিদ্ধান্তে অটল করেছে। শিশু ঈশ্বর বাবাকে মোটেও ভয় পেতেন না,বরং বাবা যা বলতেন,ঠিক তার উল্টোটি করতেন।বাবা যদি বলতেন-ঈশ্বর স্নান করো,সাথে সাথে ঈশ্বর ‘স্নান করবো না’বলে গোঁ ধরতেন।তাই বাবা এক নতুন ফন্দি আঁঁটলেন। বাবা বললেন-ঈশ্বর আজ পড়া নয়,শুধু খেলা। অমনি ছেলে খেলা ছেড়ে বসে গেল পড়তে।শুধু কী তাই।গ্রামের নামকরা ডানপিটে ঈশ্বর পাঠশালা যাবার পথে লোকের ধানক্ষেত-যবক্ষেত ইচ্ছে মতো মাড়িয়ে দিতেন। ধানের ছড়া ছিঁড়তেন, ছড়াতেন। তাঁর দস্যিপনার সহচর ছিল গ্রামের কিছু সমবয়সী ছেলের দল। এরাও ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘরের ছেলে। দুরন্ত আর অবাধ্য বালক ঈশ্বর গুরুমশায়ের অতি প্রিয় ছাত্র ছিলেন,কারণ ঈশ্বর আর যাই করুক পাঠে খুব মনোযোগী ছিলেন। তাঁর স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। ছয় বছরের পাঠ মাত্র তিন বছরেই শেষ করে ফেললেন। গুরুমশায় তাঁর পিতাকে ডেকে বললেন,ওকে কলকাতায় পড়ালে ভলো হতো,ওর যা মেধা তাতে নিশ্চয় ও একজন মস্ত বড় বিদ্বান হবে। কলকাতায় ভর্তি হওয়াই ঠিক হলো। সেসময় ভাল লেখাপড়ার জন্য কলকাতায় না যেয়ে উপায় ছিল না। শুভদিনে যাত্রার দিন ধার্য হলো। পিতা-পুত্রের সাথে চললেন গুরুমশায় এবং একজন চাকর । মেদেনীপুর থেকে কলকাতা প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে। যানবাহন বলতে কেবল নৌকা। নৌকায় নানান বিপদের সম্ভাবনা। তাই হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।অতি উত্সাহে হাঁটতে থাকেন আট/নয় বছরের ঈশ্বর। পথে যেতে যেতে হাজারো প্রশ্ন তাঁর।ছেলের কৌতুহল আর প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব দেখে বাবা ভুলে গেলেন অভাবের কথা। কলকাতায় একজনের বাড়িতে বাবার সাথে থাকতেন ঈশ্বর এবং ছোট এক ভাই। নিয়মিত দু’বেলা আহারের সংস্থান করা বেশ কষ্টকর ছিল পিতা ঠাকুরদাসের।এছাড়া টুকিটাকি অনেক কাজ যেমন রান্না করা,বাটনা বাটা,বাসন মাজা এসব করতে হতো কিশোর ঈশ্বরকে।অভাব-অনটন-ক্ষুধা নষ্ট করতে পারে নি ঈশ্বরের লেখাপড়ার অদম্য ইচ্ছাকে। কলকাতার সংস্কৃত কলেজে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ঈশ্বরের লক্ষ্য ছিল ভালো ফল করতেই হবে। করেছেনও তাই। ভালো ফলাফলের জন্য বৃত্তিও পেয়েছেন। ব্যাকরণ,কাব্য,অলঙ্কার, বেদান্ত,স্মৃতি,ন্যায় ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের জন্য ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। দারিদ্র্যের জন্য পিতা-মাতার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিল না। বরং পিতা-মাতার প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি।সততা,সরলতা,দানশীলতা,মানুষের জন্য কষ্ট পাওয়া এসব গুণ পেয়েছেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে।বেজায় রকম আত্মসম্মানবোধ ছিল তাঁর। মাইকেল মধুসূদন তাঁকে ‘greatest bangali.’ বলেছেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন —‘ক্ষতির আশঙ্কা উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বারংবার আত্মসম্মান রক্ষা করেছেন।’তিনি এও বলেছেন যে,বিদ্যাসাগর অকৃত্রিম মনুষ্যত্বের অধিকারী ছিলেন। বিধিদত্ত সম্মান পূর্ণভাবে নিজের অন্তরে লাভ করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।সংস্কৃতে পণ্ডিত হয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী ছিল উদার,চেতনা ছিল সংস্কারমুক্ত। বাংলা গদ্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বিদ্যাসাগর’ বলেই সুপ্রতিষ্ঠিত।