কুয়াশাঢাকা হিমেল শরতের সকালে জিলহজ্বের ১০ তারিখ নিয়ে এলো ঈদুল আজহার খোশ আমদেদ নিয়ে এলো ত্যাগ, প্রেম-প্রীতির বার্তা। ঈদুল আজহাকে কুরবানির ঈদও বলা হয়। ইসলাম ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে কুরবানি। চরম ত্যাগের দীপ্ত মহিমায় সমুজ্জ্বল ঈদুল আজহার ইতিহাস। পবিত্রগ্রন্থ কুরআনে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর অন্যতম নবী। প্রেরিত পথ প্রদর্শক। তিনি ইমানের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে খলিলুল্লাহ উপাধি লাভ করেন। তিনি স্বীয়গোত্রীয় রীতিনীতি হিসাবে নিজেকে স্রষ্টার বাণীবাহকরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। তার উপর পরম করুণাময় স্রষ্টার শাশ্বতবাণী ভেসে এল ‘কুরবানি দাও। কুরবানি দাও তোমার প্রিয় বস্তুকে।’ তিনি ভাবতে লাগলেন তার সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কী হতে পারে। তার বার্ধক্যের দোরগোড়ায় জন্ম দেন হযরত ইসমাইল। জীবনের শেষপ্রান্তে লাভ করা পুত্র যে কতটুকু প্রিয় হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার হূদয়ের অতল গভীর থেকে উকি মারল প্রিয় পুত্রের প্রতিচ্ছবি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পুত্রকেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরবানি করবেন। ইব্রাহিমের দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত হাজেরার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন ইসমাইল। পিতার কাছ থেকে কিশোর ইসমাইল আল্লাহর নির্দেশ সম্পর্কে অবহিত হন। একটুও বিচলিত হননি তিনি। তিনিও যে স্রষ্টার প্রেমে নিজের হূদয় উত্সর্গ করে দিয়েছিলেন। তাই দেহের কোনও মূল্য ছিল না তার কাছে। প্রকৃত প্রেমিক তার প্রেয়সীর সুখের পথ মসৃণ করতে যেভাবে তাকে ত্যাগ করতে পারে, ইসমাইল সেভাবে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নিজের দেহের, জীবনের বিসর্জন দিতে একটুও পিছু হটেননি। হযরত ইব্রাহিম
পুত্রকে কুরবানি করতে নিয়ে গেলেন নির্জন মিনা প্রান্তরে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পিতাপুত্রের একতরফা প্রেমের যোগ্য প্রতিদান দিয়েছেন। নিজ হাতে কুরবানি করবেন আর পুত্র নিজেরই ইচ্ছায় জীবনের প্রজ্বলিত প্রদীপ নিভিয়ে দেবেন, তা হয় না। তাই স্রষ্টা কেড়ে নেননি ইসমাইলের জীবন। ‘হূদয় খুড়ে কে হায় বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।’ তাই হূদয়ে পাথর চাপা দিয়ে পিতা পুত্রের গলায় সজোরে ছুরি চালালেন। চোখ খুলে দেখেন পুত্রের জায়গায় কুরবানি হয়ে আছে একটি জন্তু। চতুষ্পদ প্রাণী দুম্বা। সেই থেকে রচনা হলো ত্যাগের ইতিহাস। তাই শত শত বছর ধরে মানুষ সেই ত্যাগের স্মরণ করছে। সেই থেকে শুরু হলো কোরবানি, কুরবানি করা। হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে। এই কুরবানিকে ঘিরে আনন্দের উত্সব ঈদুল আযহা। যারা মক্কায় হজব্রত পালন করতে যান তারা মিনা প্রান্তরে সম্পাদন করেন কোরবানি। ইসলাম ধর্মের মূল পাঁচটি অবশ্য করণীয় কাজের মধ্যে হ্জ অন্যতম, তবে তা শুধূমাত্র বিত্তশালীদের ক্ষেত্রে। কুরবানির মাংস তিনভাগের একভাগ দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়, যাতে সেও উপভোগ করতে পারে ঈদের আনন্দ। কিন্তু শুধুমাত্র পশূ কুরবানি করলেই যে দায়িত্ব খালাস তা নয়, এর বিশেষ তাত্পর্য রয়েছে। পশু কুরবানির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া হলো প্রকৃত কুরবানি। হত্যা করতে হয় মানুষের রিপুকে। কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদিকে সংহার করতে হয়। মানুষের রক্তের মধ্যে বিরাজমান পশুত্বকে বর্জন করে প্রকৃত আত্মশূদ্ধির নামই কুরবানি। তবেই আসে ঈদের প্রকৃত আনন্দ।
