পবিত্র ঈদ-উল-আজহার ৪৮ ঘণ্টা বাকি থাকতেই রীতিমতো ফাঁকা হয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতির নগরী ঢাকা। শেকড় সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে মায়াবী এই শহর ছেড়ে লাখ লাখ মানুষ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছেন গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে, পৈতৃক ভিটেমাটিতে। লাখো মানুষ রয়েছেন পথে-প্রান্তরে, ঈদের উত্সবের কাফেলায়। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর অধিকাংশ সড়কে যানবাহনের তেমন কোনো চাপ লক্ষ্য করা যায়নি। তবে তিন বাস টার্মিনাল, সদরঘাট নদীবন্দর ও কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় বেশ যানজট ছিল। এ কারণে ঘরমুখো মানুষ রাজধানী ছাড়ার পথে যথারীতিই কিছুটা বিড়ম্বনার শিকার হন। এজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই দায়ী করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে বিশেষ ঈদ সেবার প্রথম তিনদিন কিছুটা সিডিউল বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লেও গতকাল সোমবার অধিকাংশ ট্রেনই কমলাপুর থেকে প্রায় যথাসময়ে ছেড়ে গেছে। অন্যদিকে মহাসড়কের যানজটও অনেকখানি কমে গেছে। বিশেষত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের যানজট রবিবার রাত থেকেই বেশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। গতকাল দিনের বেলায় ২০ কিলোমিটার মতো যানজট ছিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে। এছাড়া রাজধানীর উত্তরা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কেও দিনভর থেমে থেমে যানজট সৃষ্টি হয়। ঈদের আর একদিন বাকি থাকতে গতকাল থেকে রাজধানীর সিটি সার্ভিসের বিপুল সংখ্যক বাস ঢাকার কাছাকাছি বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী বহন করেছে। এছাড়া ট্রেন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের টিকিট না পেয়ে শেষ মুহূর্তে অনেকেই রেন্ট-এ কার থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দিয়েছেন।
গতকাল দুপুরে গাবতলী বাস টার্মিনালে যাওয়ার পথে যথারীতিই শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মাজার রোড এলাকায় যানজটের কবলে পড়তে হয়েছে। গাবতলীতে পৌঁছে দেখা গেল সেই পুরনো দৃশ্য। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী কয়েকটি পরিবহনের গাড়ি রাস্তার ওপর এলোমেলো দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। পাশেই ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্টদের কয়েকজন মোটরসাইকেলের ওপর বসে কিংবা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকা বাসগুলোর ব্যাপারে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। মূলত সে কারণেই গাবতলী অভিমুখী ঈদ-যাত্রীদেরকে অযথাই ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হচ্ছে। টার্মিনালের ভিতরে ঢুকে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোর চিত্র এদিন কিছুটা ভিন্ন। অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় বেশ কম। এর কারণ জানতে চাইলে এস আর ট্রাভেলসের এক কর্মী জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট কমে যাওয়ায় ঢাকার বাইরের গাড়িগুলো তুলনামূলক কম সময়ে ঢাকায় এসে পৌঁছাতে পারছে। ফলে বিভিন্ন গন্তব্যের গাড়িগুলো ছেড়েও যাচ্ছে পূর্বনির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে। তিনি বলেন, রাস্তায় যানজট না থাকলে যাত্রীদের ভোগান্তি কম হবে এটাই স্বাভাবিক। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকাতেই দেখা গেল, রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বেশকিছু বাস মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করছে। কিছু গাড়ি যাচ্ছে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত। এসব বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু অসহায় যাত্রীরা বাধ্য হয়েই এগুলোতে ভ্রমণ করছেন। দেশবাংলা পরিবহন নামের একটি বাসের এক হেলপার জানায়, ঈদের কারণে শহরের ভিতরে যাত্রী নেই। তাই এই সুযোগে তারা ঢাকা-পাটুরিয়া রুটে যাত্রী টানছে।
কেবল বেসরকারি বাস নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি’র সিটি সার্ভিসের অনেকগুলো বাসও ঈদ স্পেশাল সার্ভিস হিসাবে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করানো হচ্ছে। ঘরমুখো যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়েই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান বিআরটিসির কর্মকর্তারা। বিআরটিসির একটি সূত্র জানায়, এবার ঈদে ঢাকা থেকে বিআরটিসি’র বহরের ৫০০ বাস স্পেশাল সার্ভিস প্রদান করছে। সিটি সার্ভিস এবং স্টাফ বাস হিসাবে পরিচালিত এসব বাস ঢাকা থেকে এবং সারাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক রুটে সর্বমোট এক হাজার বাস স্পেশাল সার্ভিস বহরে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেবা দিচ্ছে। গাবতলীতে বিআরটিসির একটি দ্বিতল বাসে যাত্রী তুলতে দেখা গেল। রংপুরগামী এই বাসে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৬০০ টাকা করে।
অন্যদিকে আগের ৩/৪ দিনের তুলনায় মহাসড়কগুলোতে গতকাল যানজট অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। তবে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেতন-ভাতা পেয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয়ার কারণে গতকাল টঙ্গী, গাজীপুর, শ্রীপুর, সাভার ও কালিয়াকৈর এলাকায় মহাসড়কে বেশ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষত গাজীপুর চৌরাস্তা ও চন্দ্রা মোড় কেন্দ্রিক এসব যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশের বেশ তত্পরতা ছিল। তারপরও থেমে থেমে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের কারণে এলাকায় ঘরমুখো মানুষদের ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত আটকা থাকতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন আজ মঙ্গলবার থেকে আর কোনো যানজট থাকবে না মহাসড়কে।
গতকাল বিকালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের তিনদিনের মতোই গতকালও সকাল থেকে প্রতিটি লঞ্চ ছেড়ে গেছে যাত্রী বোঝাই হয়ে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যাত্রী তোলা হয়েছে লঞ্চের ছাদে। এ ব্যাপারে টেলিফোনে বিআইডব্লিউটিএ’র একজন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী পরিবহনের ব্যাপারে নজরদারির জন্য মনিটরিং টিম কাজ করছে। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতি ভাল থাকায় খুব বেশি কড়াকড়ি করা হচ্ছে না। ঘরমুখো মানুষের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
