২০১৫ পরবর্তী উন্নয়নের প্রশ্নে মাননীয় অর্থমন্ত্রী তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন— ১. দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হ্রাস। ২. দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং ৩. এগুলোর পাশাপাশি কর্মদক্ষতা বাড়ানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। গত ২৫ আগস্ট অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় কর্মশালায় এ কথাগুলো তিনি বলেন (ইত্তেফাক ২৬-৮-২০১৩)। ঐ একই দিনে ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফিন্যান্স (আইএনএম) আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনে বলা হয়েছে, ‘দেশে এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষুদ্রঋণ চালু করতে হবে। এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই উন্নয়নের সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।’ (প্রথম আলো ২৬-৮-২০১৩)। সম্মেলনে পেশকৃত পরিসংখ্যানে জানা যায়, সবে আমরা ৫% দারিদ্র্য হ্রাসে সক্ষম হয়েছি। চার দশকে আমাদের অর্জন ২০ ভাগের ১ ভাগ। বাকি ১৯ ভাগের জন্য আমাদের কতটুকু কীভাবে দৌড়াতে হবে তার ধারণা স্পষ্ট করে পাওয়া যায় না। যতটুকু বলা হয় তাও আবার ভাসা ভাসা। দারিদ্র্য হ্রাসে আমরা স্পষ্ট উচ্চারণ কামনা করি।
এসব আলোচনা যত সহজ, আমাদের পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটে বাস্তবতার কাছাকাছি যাওয়া ততই দুরূহ। চার দশকের ওপর সময় গেছে। তত্ত্বকথার সঙ্গে প্রত্যক্ষ কর্মসূচির সংযোগ না ঘটালে আমাদের পস্তাতে হবে। পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, কোনো দেশ বা জাতি উন্নতির সোপানে পৌঁছুতে পারে না নিজ মেধা-মনন ও কর্মপদ্ধতির উত্কর্ষ ছাড়া। আমাদের তেমন যোগ্যতা আজো বাঞ্ছিত রকম তৈরি হয়নি। আমাদের কর্মপদ্ধতি বড় সেকেলে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা হয়তো প্রশংসার দাবি রাখে, তারপরও তাতে রয়েছে বিতর্ক, ভিন্নমত। এসব বিতর্ক বা ভিন্নমত সারবত্তাহীন এমনটিও বলা যাচ্ছে না। আমাদের কর্মপদ্ধতির সংকীর্ণতা, অসারতার বহু দিক, বহু নজির রয়েছে। এখানে একটি ঘটনার কথা বলছি।
বিষয়টি একটি আবেদনপত্র সম্পর্কে। আমাদের দেশে যে কোনো আবেদনের সাধারণ (কমন) একটি তিক্ত দিক রয়েছে। যত গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় হোক না কেন উত্তর পাওয়া যাবে না। সরকারি, আধা-সরকারি যে কোনো অফিসে, বেসরকারি এমনকি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বার বার চিঠি দিলেও তার উত্তর পাওয়া যায় না। সবাই যেন কেয়ামত পর্যন্ত উত্তর না দেওয়ার ধনুক ভাঙা পণ করে বসে আছেন। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে চিঠি লিখলে উত্তর আসবে— এমনটি হওয়া উচিত। মোবাইলে ঘন ঘন মেসেজ আসে তথ্য-অধিকার বিষয়ে। কিন্তু প্রয়োজনে তথ্য পাওয়ার আবহ নেই কোনো অফিসেই। আইন দেখিয়ে কোনোকালেই অধিকার রক্ষা হয় না। ইদানীং এনজিওরাও পুরাতন পথেরই যাত্রী হয়েছে। ‘কাজ করলে ভালো, না করলে বেশি ভালো’ সত্যটি ওরাও কেমন করে বুঝে ফেলেছে!
ঐ পত্রটির বিষয়বস্তু এ রকম— ‘আমি একজন কমবয়সী কৃষি শ্রমিক (কামলা)। হাওর পাড়ে বাড়ি। দারিদ্র্যের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়তে পারিনি। নিতান্ত অল্প বয়স থেকেই অন্যের বাড়িতে কাজ করি। বর্ষায় মাছ ধরি, বোরো মৌসুমে কৃষি শ্রমিক। বাবা-মা নিয়ে ৫ জনের সংসার। বাবা সারাজীবন অন্যের বাড়িতে মজুরি করেছেন। আমাকেও মানুষের কামলা হয়ে জীবন কাটাতে হবে ভাবতে কষ্ট হয়। জমিজমা নেই বললেই চলে। একটি ঘরসমেত ছোট্ট বাড়িটিই পারিবারিক সম্পদ। নানা অনিবার্য প্রয়োজনে দিনে দিনে পারিবারিক ঋণ হয়েছে ১ লক্ষাধিক টাকা। এই ঋণের জন্য মাসে মাসে চড়া সুদ গুনতে হয়। কামাইয়ের টাকা সুদের পেছনেই চলে যায়। এই ঋণ পরিশোধের কথা চিন্তা করে আমি, আমরা দিশেহারা। ভয়ে আছি, শেষ পর্যন্ত বাড়িঘর বিক্রি করে দিতে হয় কিনা ভেবে। আপাত এই ঋণ পরিশোধের পথ দেখছি না। এ সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য একটি পাওয়ার টিলার (ডিজেল চালিত হাল-কর্ষণ মেশিন) অনুদান হিসেবে পেতে চাই। টিলার চালানোর বাস্তব যোগ্যতা আমার আছে। এর মাধ্যমে ভাড়া খেটে তথা অন্যের জমি কর্ষণ করে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধসহ আমাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবো বলে আশা রাখি। নিদেনপক্ষে স্বল্প সুদে/ সার্ভিস চার্জে সহজ শর্তে টিলার ক্রয়ের টাকা ঋণ হিসেবে পেতে আগ্রহী। প্রয়োজনে আমার পক্ষে ঋণ পরিশোধের গ্যারান্টার হওয়ার মতো লোক পাওয়া যাবে।’ ব্যাংক ও এনজিওসহ নানা প্রতিষ্ঠানে ধরনা দিয়েও এ আবেদনপত্রটির বিষয়ে আবেদনকারী সাড়া পাননি। বহু চেষ্টা করেও কাউকেই এ ব্যাপারে গলানো যায়নি। প্রশ্ন হলো, এরূপ পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য অবস্থার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচন বা প্রশস্ত করার আর কোনো পথ খোলা আছে কি? অনুদান বা ঋণপ্রাপ্তি তো দূরের কথা আবেদনপত্রটির গতি সম্পর্কে দু’বাক্যের একটি উত্তরও কেউ দেননি।
বর্ণিত আবেদনকারীর মতো হাজার হাজার লোক দেশে আছেন। যারা একটু অনুকূল সুযোগ পেলেই জাতীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ছাপ রাখতে পারেন। ওদের ব্যাপারে সরকার বা এনজিওর ভূমিকা ধোঁয়াচ্ছন্ন। আমাদের দেশে গতানুগতিকতার বাইরে যেন কেউ কাজ করতে পারে না। একটি এনজিও সূত্রে জানা গেছে, তারা টিলারের জন্য ঋণ প্রদান করে সেইসব লোককে, যাদের নিজস্ব টিলার আছে এবং কমপক্ষে দুই বছর তা চালিয়ে আসছে। (তেল্লুয়া মাথায় তেল!)। বাস্তবতা এই—দু’বছর টিলার চালিয়ে খেয়েদেয়ে চলার পরও আরেকটি নতুন টিলার কেনার সক্ষমতা সৃষ্টি হয়। তার ঋণের বোঝা নেওয়ার দরকার নেই। যে নতুন আবেদনকারী সে টিলার পেলে এক-দু’বছরে সক্ষম হতে পারে। অথচ যার প্রয়োজন সে ঋণ পাবে না। যে কোনো ব্যাংক থেকে টিলার পাওয়ার ঝক্কি-ঝামেলা কম নয়। কর্মকর্তাদের খুশি করার বিব্রতকর ব্যাপারটির প্রাধান্যের কথা তো সূর্যালোকের মতো সত্য। কীভাবে একজন নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কৃষি বা শিল্পে নিজেকে সম্পৃক্ত করবে, ভাগ্য বদলাবে? অন্যদিকে টিলার কেউ চিবিয়ে খায় না; এর দ্বারা হাল-চাষ হবেই। তাতে জাতীয় কৃষি অর্থনীতিও হবে বেগবান। তারপরও কেন বর্ণিত আবেদনকারী প্রার্থিত সুযোগটি পাবেন না? নানা বাহানায় ব্যাংক থেকে, প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়। আর যে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে যুগপত্ নিজের ও দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত হতে চায় তার প্রাপ্তির দ্বার থাকে রুদ্ধ। কথায় চিড়ে ভিজে না। আমাদের পদ্ধতির মারপ্যাঁচে কর্মসংস্থান অর্থনীতির উন্নয়ন আজ ‘দূর ওয়াস্ত’। অর্থনীতিকে বেগবান করতে কম বয়সী কৃষিশ্রমিক, নতুন উদ্যোক্তাদের আবেদনকে অগ্রাধিকারভিত্তিক মঞ্জুরি দেওয়া দরকার সর্বাগ্রে।
নেত্রকোনা
