আবারও অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারালো নয়জন গামের্ন্টসশ্রমিক। গরিব মানুষের প্রাণের যে কোনো মূল্য নেই তা বার বার প্রমাণ করে এদেশের পোশাকশিল্প। গত ৯-১০-২০১৩ তারিখে গাজীপুরের শ্রীপুরে পলমল শিল্প গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানা আসওয়াদ কম্পোজিটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর এই অগ্নিকাণ্ডে জীবন্ত দগ্ধ হয় গার্মেন্টসশ্রমিকেরা। এবারে জীবন্ত দগ্ধদের সঙ্গে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও প্রাণ হারান। মালিক কর্তৃপক্ষ অগ্নিদগ্ধ নিহত শ্রমিকদের পরিবার প্রতি ৩০ হাজার টাকা অনুদান এবং নিহতের লাশ দাফনের জন্য যা খরচ লাগবে তা বহন করবেন। এই প্রতিশ্রুতি দানে মনে হয় এটা এক নিহত শ্রমিকের জন্য বিশাল প্রাপ্তি। আর এভাবেই এই পোশাকশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য আত্মদান করছেন এদেশের পোশাকশিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকেরা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কেন বার বার এভাবে শ্রমিকদের প্রাণ দিতে হয়? সারি সারি লাশ হওয়ার পর কেন শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হয় না? নিকট অতীতে স্পেকট্রাম ভবন ধস, নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, সাভারের রানা প্লাজা ধসে কয়েক হাজার গার্মেন্টসশ্রমিক প্রাণ হারিয়েছে। এসব দুর্ঘটনা কি নিছক দুর্ঘটনা? প্রতিটি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে , তদন্ত কমিটি তদন্ত করেছেন, কোনো তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেছে আবার কোনোটা দেখেনি। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আলোকে এ শিল্পের দুর্ঘটনা রোধে চোখে পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এটা শুধু দুঃখজনক ঘটনাই নয়—এটা দেশের শ্রম সম্পদের প্রতি চরম অবজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ।
গামেন্টসশিল্পের প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের আর্থিক সহযোগিতার কথা ঘোষণা করা হয়। এই আর্থিক সহযোগিতার ওপর ভর করে কি শ্রমিক পরিবার চলতে পারে? তা কি দেশের বিজ্ঞ জনেরা কখনো ভেবে দেখেছেন? বিশ্ব মন্দার কালেও দেশের অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থানে ধরে রেখেছে এই গার্মেন্টসশিল্প আর এই শিল্পের মূল দেশীয় উপাদান হচ্ছে শ্রমিকদের শ্রম। শ্রমিকের শ্রমই হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার। দেশের বৈদেশিক আয়ের ৮০ভাগ অর্জিত হয় পোশাকশিল্প থেকে। তাহলে কেন পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবে না ? গার্মেন্টসশিল্পের দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন একথা ঠিক। কিন্তু তাদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নানা ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন ব্যাংকঋণের সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, কর রেয়াত , শুল্কমুক্তি ইত্যাদি পক্ষান্তরে গার্মেন্টসশ্রমিকেরা দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর তাদের পরিবারকে পথে পথে ভিক্ষা করতে দেখা যায়। গার্মেন্টসশ্রমিকের সামাজিক অবস্থান মূল্যায়ন করলে দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া পরিবারের উপার্জনক্ষম বিকল্প ব্যক্তি আর থাকে না । তাই গার্মেন্টসশিল্পের শ্রমিকের জীবনকে সস্তা হিসেবে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। কিন্তু আমরা দেখছি এদেশে গামের্ন্টসশিল্পে সস্তায় শ্রম পাওয়া যায় বলেই তাদের জীবনের মূল্য দেওয়া হয় না। শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলা করা হচ্ছে, ফলে বাড়ছে গার্মেন্টসশিল্পের দুর্ঘটনা।
উত্পাদন অর্থনীতির ভাষায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো শ্রম। বাংলাদেশ একটি অধিক জনসংখ্যার দেশ কথাটি সত্য তবে দেশটি শ্রম সম্পদে পরিপূর্ণ। আমরা যদি একটু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখবো যে, এদেশের শ্রম সম্পদ শুষে নেওয়া হচ্ছে নানা কৌশলে। গার্মেন্টসশ্রমিকেরা অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হয় স্বল্প মূল্যে শ্রম বিক্রি করে। গার্মেন্টসশিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের শ্রমের মূল্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে তুলনা করা তো দূরের কথা দেশীয় বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয় না। আসলে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রম যে ভোগের অন্যতম পণ্য তা প্রমাণ করে এদেশের পোশাকশিল্পের নিয়োজিত শ্রমিকের শ্রম।
রাজশাহী
