চাঁদপুরে ইলিশ প্রজনন মৌসুম হিসেবে সরকার ১৩ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনায় সকল ধরনের জাল ফেলা, মাছ ধরা, পরিবহন ও ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করলেও তা না মেনে জেলেরা দিন ও রাতে অবাধে ডিমওয়ালা মা ইলিশ শিকার করে চলেছে। মেঘনা উপকূল এলাকার আড়তগুলোতে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এসব ইলিশ।
সরেজমিন চাঁদপুর সদর উপজেলার পশ্চিম কল্যাণপুর দাসাদী, তরপুরচন্ডী আনন্দ বাজার, শহরের বিকল্প লঞ্চঘাট এলাকা, পুরান বাজার রনাগোয়াল, বহরিয়া বাজার, লক্ষ্মীপুর মৃধাবাড়ী সংলগ্ন ঘাট, হানাচার ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট ও আখনের হাটে ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়। এসব মা ইলিশ আড়তে খুচরা ও পাইকারী বিক্রি হচ্ছে অবাধে। খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা এসব ইলিশ বাজারে না বিক্রি করে বাড়ি বাড়িতে ফেরি করে বিক্রি করছে।
আনন্দ বাজার এলাকার মনির, কাদির, দাসাদী মাছঘাট এলাকার চা দোকানদার সুমন মিজি জানান, ১৩ তারিখের পর এখন পর্যন্ত একদিনও পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ড আসেনি। দিন-রাত এ ঘাটের নেতা ইউছুফ তালুকদার মাছ বিক্রি করে যাচ্ছে। পুলিশের ভয়ে স্থানীয় জেলেরা দিনে মাছ না ধরলেও রাতের বেলায় মাছ শিকারে নামে। এ অঞ্চলে প্রায় ২শ’ কার্ডধারী জেলে রয়েছে। আনন্দ বাজার এলাকার চিত্র একটু ভিন্ন রকম, এখানে জেলে সংখ্যা প্রায় ৫শ’। শহরতলী হওয়ার কারণে কোস্টগার্ডের অভিযানের সময় পালিয়ে গেলেও ঘরবাড়িতে রেখে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। ৮শ’ থেকে ৯শ’ গ্রাম ওজনের এসব ইলিশের প্রত্যেকটিতে ডিম রয়েছে।
আখনের হাট, হরিণা, মৃধাবাড়ী সংলগ্ন মাছঘাটের ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে মোবাইলে যোগাযোগ। কোস্টগার্ড চাঁদপুর থেকে রওয়ানা হলেই তাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে যায়। তারা কোস্টগার্ড স্টেশন এলাকায় নিজেদের লোক রেখে মা ইলিশ নিধন ও আড়তে জমজমাট ক্রয় বিক্রি চালাচ্ছে। হরিণা ঘাটে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গিয়ে এবং পুলিশকে টাকা দিয়ে ঘাট পরিচালনা করছে বলে জানায়। শহর ও গ্রামের শত শত লোক ইলিশ ক্রয় করতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব আড়তে ভিড় জমাচ্ছে। ১৪ ও ১৫ অক্টোবর কোস্টগার্ডের কয়েকটি অভিযান হলেও ঈদের দিন ও তার পরদিন বড় ধরনের অভিযান দেখা যায়নি।
সেপ্টেম্বর মাসে চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইন-শৃংখলা সমন্বয় সভায় জেলা প্রশাসক মো. ইসমাইল হোসেন জেলা মত্স্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও পুলিশ বিভাগকে আন্তরিক হয়ে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি কোস্টগার্ডকে এ বিষয়ে গুরুদায়িত্ব পালন করার কথা বলেন।
পুলিশ সুপার মো. আমির জাফরকে মাছঘাটগুলোতে প্রকাশ্যে মাছ ক্রয়-বিক্রয়ের কথা জানালে তিনি বলেন, ঈদ ও পূজার কারণে আমাদের লোকবল কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার লেঃ এম. জহিরুল আলম জানান, মা ইলিশ নিধন না করার জন্য প্রচার প্রচারণা করা হলেও জেলেদের মধ্যে সচেতনতা দেখা যায়নি। নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তারা মা ইলিশ নিধন করছে। আমাদের যে পরিমাণ লোকবল রয়েছে, তা নিয়ে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘন্টা অভিযান পরিচালনা করছি। তবে মাছঘাট এলাকার স্থানীয় কিছু লোক আমাদের সহায়তা করবে বলেও আড়ালে গিয়ে তারা ইলিশ ক্রয়-বিক্রয় কাজ করছে। অনেক মত্স্যজীবী নেতা এর সাথে জড়িত রয়েছেন।
চাঁদপুর জেলা ভারপ্রাপ্ত মত্স্য কর্মকর্তা রতন দত্ত জানান, নিষেধাজ্ঞার পর থেকেই মত্স্য বিভাগ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য ঢাকা থেকে মত্স্য বিভাগের কর্মকর্তাগণ চাঁদপুরে এসেছেন।
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা ঃ প্রজনন মৌসুমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মেঘনা নদীতে মাছ ধরায় ১৩ অক্টোবর হতে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৬ দিনে লক্ষ্মীপুর জেলায় ৩৩ জন জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আটককৃত ২৩ জনের প্রত্যেককে ৩ মাস হতে ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড প্রদান করেন। কিশোর বয়সী হওয়ায় বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়। লক্ষ্মীপুর জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, মত্স্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নির্বাচিত ইউপি সদস্যদেরকে নিয়ে ঘোষিত টাস্কফোর্স মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে এদেরকে আটক করে। টাস্কফোর্স ১৪ লক্ষ মিটার জাল ও ৩২টি মাছ ধরার নৌকা আটক করে নদীতে বিনষ্ট করে ফেলে।
