ছিন্নমূল শিশুদের আনন্দ

ঈদ অনুভূতি স্পর্শ করে না তাদের

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৩, ২৩:০০
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হলো গত বুধবার। দেশব্যাপী ধনী ও মধ্যবিত্তদের মাঝে কোরবানিসহ ছিল নানা আয়োজন। দামি পশু কোরবানিসহ নানা বাহারি ধরনের খাবার আয়োজনে ছিল অন্যরকম বৈচিত্র্য। কিন্তু রাজধানীর ফুটপাতে বেড়ে ওঠা ছিন্নমূল শিশুদের ঈদ আনন্দ নিয়ে ভেবেছেন কয়জন। ঈদের দিন কেমন কাটিয়েছে তারা, এ খোঁজটুকু রাখার প্রয়োজন মনে করেননি অনেকেই। প্রতিদিন দুবেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য ছোটাছুটি করা যাদের নিত্যসঙ্গী, ঈদ অনুভূতি তাদের কতটুকুই স্পর্শ করতে পারে? ঈদ কিভাবে কেটেছে এ নিয়ে বেশ কয়েকজন ছিন্নমূল শিশুর সঙ্গে সরেজমিনে এই প্রতিবেদকের আলাপ হয়েছে। তারা জানায়, ঈদ কি, ঈদের দিন কি হয়, এনিয়ে তারা কখনো কিছু ভাবেনি। তবে বড় বড় সাহেবদের দামি পশু কোরবানির আয়োজন দেখে তারা। মাংসের ভাগ পেতে তারা ভিড়ও জমায় না পিটুনী খাওয়ার ভয়ে। রান্না করে খাওয়ার কোনো প্রস্তুতি তাদের থাকে না কখনো। তবুও মাংস সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য। তাদের কাছে ঐ সব আনন্দ যেন হরিষে বিশাদ। তারা শুধু ব্যস্ত প্রতিদিনের আহার যোগাতে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের থাকা খাওয়া। ছিন্নমূল শিশুদের ৯৫ ভাগই রোগাক্রান্ত। ঈদ কোন দিন, কি তার পরিবেশ, সেটা তাদের পক্ষে বুঝা কঠিন। কোরবানির মাংস কেউ কেউ তাদের দিয়েছে। তবে মাংসের জন্য মারধরও খেতে হয়েছে। যারা মাংস পেয়েছে, তারা তা বিক্রি করে পরের দিনের জন্য খাবার কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জন্মের ঠিকানাও বেশির ভাগ ছিন্নমূল শিশু জানে না। ফুটপাতেই তারা বড় হয়েছে বলে অনেকে জানায়। মাংস পাওয়ার পর তারা বুঝতে পেরেছে যে এটা কোরবানির ঈদ। কেউ কেউ আবার পিতার সঙ্গে ফুটপাতে থাকে। মাংস রান্না করে ফুটপাতে পিতামাতার সঙ্গে খেয়েছে কেউ কেউ। ছিন্নমূল শিশুরা চরম অবহেলা বঞ্চনা, লাঞ্ছনা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে বেড়ে উঠে। এক সময় তাদের বেশির ভাগই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ পেশাদার ভয়ংকর কিলারের জন্ম হয়েছে ফুটপাতে। এমন দাগী অপরাধীর সংখ্যা অনেক বলে র্যাব ও পুলিশ জানিয়েছে। এ সব শিশুকে অবহেলা না করে, দেশের স্বার্থে অন্য শিশুদের ন্যায় বেড়ে উঠার সুযোগ দিলে তারা দেশের সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে পারে- এমন মন্তব্য অপরাধ বিশেষজ্ঞদের। কাওরান বাজারের ছিন্নমূল শিশু ইসলাম (১০)। বাড়ি বগুড়া। তার পিতা মারা যাওয়ার পর মা খাদিজা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। এই ইসলাম ৮ বছর যাবত্ কাওরান বাজার ও রেল লাইনের পাশে বেড়ে উঠছে। ঈদের দিন কিভাবে কাটলো জিজ্ঞেস করলে চোখের পানি ছেড়ে শিশুটি জবাব দেয়, স্যার থাকি ফুটপাতে। বস্তা কাঁধে নিয়ে পুরান কাগজ, জিনিসপত্র টোকাই সারাদিন। এটা হলো আমার নিত্যদিনের বেঁচে থাকার পরীক্ষা। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকার শিশু রাজিব (৮), স্বপন (১০) ও আরিফ (১১) জানায়, তাদের পিতার নাম ঠিকানা তারা জানে না। এ স্টেডিয়ামে তাদের জন্ম এবং ঠিকানা বলে জানায়। ঈদের দিন কেটেছে বরাবরের মত মানুষের কাছে দুই একটি টাকা চেয়ে। শাহজাহানপুর এলাকায় মাংস আনতে গিয়ে কপালে জুটেছে মারধর। হাইকোর্ট এলাকার রাকিব (৯), কাদের (৭) ও সাব্বির এবং সদরঘাট এলাকায় রুমান (৮), রিয়াজ (১০), কমলাপুর রেল স্টেশন এলাকার মুক্তার (১০), রহিম (৯) ও লোকমান (১১) একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। তাদের পাশে কেউ নেই এবং আল্লাহ তাদের একমাত্র ভরসা বলে জানায় তারা।