দিবানিশি থেকো সবরে মন বা হুশিয়ারি

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৩, ২৩:০৮
লালনের গান কি কেবল স্টেজে চুল দুলিয়ে গাওয়ার জিনিস? মানুষকে ভালোবেসে, জীবনকে ভালোবেসে সমাজ থেকে ধর্মীয় মৌলবাদ, রাজনৈতিক বিভেদ দূর করতে তার লেখা গান সুরে বাঁধা জীবন ব্যবস্থা। সে কারণে লালন সাঁই বলেছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’- বলছিলেন ফকির হোসেন শাহ। লালন নিছক মরমী সাধক বা আধ্যাত্মবাদী ছিলেন না। জীবন আচরণে, গানে ও চিন্তায় ইহজগেকই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। লালনের চিন্তা ছিল পুরোপুরি দার্শনিক ও রাজনৈতিক। তার সারাজীবনের আন্দোলনে আগাগোড়াই ছিল জাত-পাতবিরোধী, ধনী-নির্ধন বৈষম্য বিরোধী। সাধকরা ফকিরি গ্রহণ করার সময় ধন-সম্পদ ত্যাগ করে ফকিরি গ্রহণ করছে। আর তারা নারী-পুরুষের ভেদ মানে না। এই শক্তিশালী দার্শনিক চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত লালনের গান। তিনি সব সময়, সব পরিস্থিতিতে সবাইকে সচেতন থাকতে বলেছেন। বলেছেন, ‘দিবানিশি থেকো সব রে মন বা হুঁশিয়ারি’। রাজশাহী থেকে আসা লালন ভক্ত ড. অনুপম হাসান বলেন, লালন অসাম্প্রদায়িক, পরমতসহিষ্ণু। কেননা বাউল ধর্মই অসাম্প্রদায়িক। বাংলাদেশে বর্তমান ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানের পরিপেক্ষিতে লালন সাঁইয়ের প্রচারিত বাউল মতাদর্শ জাতীয়ভাবে ঐক্য ও শান্তি-শৃংখলা তৈরিতে সহযোগিতা করতে পারে। বাঙালির জাতিগত অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে লালন সাঁইয়ের আদর্শ গুরুত্বপূর্ণভাবে সাযুজ্যপূর্ণ ও সমান্তরাল। সাঁইজির মতাদর্শ মানুষের ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতা মৌলবাদিতা, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি লাঘবে সহায়ক। আমাদের দেশে কতিপয় রাজনৈতিক দল যেভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি উস্কে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়, তার বিরুদ্ধে লালন সাঁইয়ের মতাদর্শ আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাগিয়ে রাখে। কিন্তু কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় সরকারি আয়োজনের বক্তৃতা ও স্টেজে বাউলদের পরিবর্তে নাগরিক শিল্পীদের ভুল উচ্চারণে গাওয়ার গান লালনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের চেয়ে অশ্রদ্ধাই দেখানো হচ্ছে। তার গান নিয়ে গবেষণায় কোন পৃষ্ঠপোষকতা নেই, নেই নতুন প্রজন্মের মাঝে তাকে ছড়িয়ে দেয়ার কোন উদ্যোগ। লালন স্মরণ উত্সবে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেয়ার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে সকল আয়োজন। লালন সাধক ও লালন গবেষকরা বলছেন, আনুষ্ঠানিকতার ডামাডোলে হারিয়ে যাচ্ছে লালনের গান। মাতামাতির জোয়ারে বানের জলের মত লালনের গানের নামে এমন সব গান ঢুকে পড়ছে যা লালনের গান নয়। গানের স্বরলিপি না থাকায় সুরের বিকৃতি ঘটছে। হারিয়ে যেতে বসেছে ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ এই লালন গীতি। এ প্রসঙ্গে ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, নগর সভ্যতা একেবারেই ফাঁপা, ভুঁইফোড়। যতদিন যাবে ফাঁপা বিষয়টি ধরা পড়বে। ভুঁইফোড়ের সংস্কৃতি ঋদ্ধ হয় না। গতানুগতিকতার কারণে আধুনিক গান মানুষকে আলোড়িত করে না। গত দেড় দশকে যেসব গান জনপ্রিয় হয়েছে, তার মধ্যে লোকসঙ্গীত আশ্রয়ী গানই বেশি। তাই এই বাউল গান, লালনের গানকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। জাতি, রাষ্ট্রের প্রেরণার জন্য, মানুষের জন্য। বাউল সম্রাট মহামতি ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৩তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণোত্সবে ছেঁউড়িয়া আখড়া এখন সাধু ভক্তদের পদচারণায় কানায় কানায় পূর্ণ। সফেদ লুঙ্গি, পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরিহিত হাজারো ভক্তের সমাগমে ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ির চারপাশ শুধু সাদা আর সাদা। আখড়াবাড়ির মূল আঙ্গিনা ও কালীগঙ্গা নদীর তীরে ভবের হাটে বসে ভজন সাধনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আগত বাউল ভক্ত সাধুরা। হাতে একতারা-দোতরা, খঞ্জনি, তবলা আর হারমোনিয়াম নিয়ে গলা ছেড়ে গাইছেন গান। আসলে গান নয় যেন আরাধনায় রত তারা। কলকাতা থেকে আসা নগেন বাউল বলেন, প্রতিবছর পারি না; তবে এবার সাঁইজির ধামে আসার সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি। তিনি বলেন, এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না মানুষে মানুষে হূদয়ের টান কি। সাঁইজি বিশ্ব মানবতার প্রতীক। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার এক গভীর জঙ্গলে সাধক শিরোমণি ফকির লালন শাহ তার অনুসারী ভক্তদের নিয়ে যে আখড়া গড়ে তুলেছিলেন তা এখন সারা বিশ্বের সব ধর্মের সব বর্ণের, সব জাতির মানুষের মিলন মেলা। ফকির লালন শাহ তার গানের বাণীর ভেতর দিয়ে একটি সুসঙ্গবদ্ধ জীবন বিধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার গান এক গভীর দ্যোতনায় এই বিশ্ব-সংসার, মানবধর্ম, ঈশ্বর ও ইহলৌকিক ও পারলৌকিকতা সম্পর্কে উদার ও সহজিয়া দৃষ্টিতে দেখতে অনুপ্রাণিত করে। সব মরমী সাধকেরই পরম্পরা থাকে। তবে লালনের দ্যুতি এমনই উজ্জ্বল ও মনমুগ্ধকর যে তারপরে আর কোন মরমী সাধক নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। দুই শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আজো লালন মরমী জগতের সার্বভৌম ব্যক্তি। লালনের গানে সবার ওপরে রয়েছে মানুষ। তিনি মানুষের মাঝেই সত্য সুন্দরের রূপ খুঁজে পেয়েছেন: মানুষরে দেখরে ভাই দিব্যজ্ঞানে পাবি রে অমূল্য নিধি এই বর্তমানে ম’লে পাবো বেহেস্তখানা তা শুনে আর মন মানে না লালন কয়, বাকির লোভে নগদ পাওনা কে ছাড়ে এই ভুবনে। আরেকটি গানে লালন বলছেন, উপাসনা নাই গো তার, দেহের সাধন সর্ব-সার, তীর্থ-ব্রত যার জন্য, এ দেহে তার সব মেলে\ এবার পহেলা কার্তিক অর্থাত্ মহামতি লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস ঈদের দিন হওয়ায় পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সবের প্রথম দিন ছেঁউড়িয়ায় সাধু ভক্তদের আনাগোনা তুলনামূলক কম ছিল। তবে দ্বিতীয় দিনের ভোর থেকে দেশের সব অঞ্চলের সাধু-ভক্তদের জোয়ার এসে আছড়ে পড়তে থাকে ছেঁউড়িয়ার কালীগঙ্গার তীরে। সাধু ভক্তরা এসে প্রথমে কালীগঙ্গা নদীতে স্নান করেন। এরপর সাঁইজির মাজারে ভক্তি প্রদর্শন করেন। প্রতিবারের মতো এবারো সাধু ভক্তরা বাল্যসেবা, পুণ্যসেবা ও অধিবাস চরম ভক্তির সঙ্গে গ্রহণ করেন। দুপুরে আখড়াবাড়ির মূল আঙ্গিনায় অবস্থানরত লালন ভক্ত শিষ্যরা পুণ্যসেবা (দুপুরের খাবার) গ্রহণের আগে সারিবদ্ধভাবে সবাই এক কাতারে বসেন। কলাপাতায় দেয়া হয় সাদা ভাত, ইলিশ মাছ, সবজি, ডাল আর দই। পরম ভক্তির সাথে খাবার সামনে নিয়ে সবাই অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে মাইকে বলা হয় আল্লা আলেখ সাঁই, সবাই পুণ্যসেবা গ্রহণ করুন। একযোগে খেতে শুরু করেন সবাই। লালন একাডেমী কর্তৃপক্ষই এসব খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে। অন্যান্যবার একদিন দেয়া হলেও এবার পাঁচদিনই তিন বেলা খাবার দেয়া হবে বলে জানালেন লালন একাডেমী কর্তৃপক্ষ। এবার বিশেষ করে খেলাফতপ্রাপ্ত সাধুর সঙ্গে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন সঙ্গী এসেছেন। এছাড়া ভারত, নেপাল, ভুটান, ফ্রান্স, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাধু ও লোকসংস্কৃতির অনুরাগীরা এসেছেন। উত্সবের দ্বিতীয় দিন অর্থাত্ ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আনুষ্ঠানিকভাবে উত্সবের উদ্বোধন করেন। লালন একাডেমীর আয়োজনে লালনের মূল মাজারের সামনে কালীগঙ্গা নদীর তীরে বসেছে লালন মেলা। এতে স্থান পেয়েছে কুঠির শিল্পজাত নানা সামগ্রী, লালনের প্রতিকৃতি, একতারা, গলার মালা, হস্তশিল্প পণ্যসহ হরেক রকম জিনিসপত্র। তবে প্রথম দুদিন থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে মেলার দোকানিদের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা। বাংলার বাউল সাধনা ও লালন ফকির ‘বাউল মানুষ ভজে, যেখানে সাঁই নিত্য বিরাজে’। মানুষ, তার স্রষ্টা এবং তার সৃষ্টির অনুসন্ধানই বাউলের মূল আরাধ্য বিষয়। বাউল সত্যের উপাসক। নিজ পরিমন্ডলে তার সাধন-ভজন, আচার-অনুষ্ঠান। বাংলার মাঠে-ঘাটে অনেক বাউল আছেন। তাদের ভজন সাধনের জন্য রয়েছে বহু আখড়া। লালন সাঁইজির গান করতে করতেই অনেকে লালন দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। গানের বাণীতে এমন দর্শনের সন্ধান তারা পেয়েছেন যার সঙ্গে ভাব আছে, অন্তরের মিল আছে। মনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায় যে বাণী। যার দর্শন একজন মানুষকে কেবল খাঁটি মানুষ হওয়ার শিক্ষাই দেয়নি জগতে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছে। পৃথিবীতে অনেক আদর্শ অনেক পথ এবং মত তার জায়গা করে নিতে অন্য আদর্শকে আঘাত করেছে, হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে। ব্যতিক্রম হচ্ছে বাউল আদর্শের অনুসারীরা। লালন তার গানে বলছেন: ‘কেউ মালা’য় কেউ তছবি গলায়, তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায় যাওয়া কিম্বা আসার বেলায় জাতের চিহ্ন রয় কার রে\ যদি ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কি হয় বিধান, বামণ চিনি পৈতা প্রমাণ, বামণি চিনে কিসে রে\ জগত্ বেড়ে জেতের কথা, লোকে গৌরব করে যথা তথা লালন সে জেতের ফাতা ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে\’ বিশিষ্ট গবেষক ও অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘বাউলের জন্মই প্রতিবাদ এবং দ্রোহের ভেতর দিয়ে। নিম্নবর্ণের মানুষ যখন সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে উচ্চবর্ণের মানুষের কাছ থেকে অশ্রদ্ধা, অপাংক্তেয় হয়ে উঠেছে, তাদের কোন অধিকারই উচ্চবর্ণের মানুষ স্বীকার করেনি তখন কিছু মানুষ ভিন্ন পথ খোঁজার চেষ্টা করেছে। সে পথ সহজ সাধনার পথ। যাতে তাদের মৌলবাদী, কূপমন্ডুক সমাজপতিদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে না হয়। সেখান থেকেই বাউলের জন্ম। সমাজের নিপীড়িত শোষিত শ্রেণী শাস্ত্রভারমুক্ত একটি নতুন সাধনার পথ খুঁজে নিল। দেহকেন্দ্রিক, গুরুবাদী সাধনার ধারা। তিনি বলেন, লৌকিক সাধনা, যোগ, তন্ত্র, মৈথুন — এ ভিন্ন আঙ্গিকে মরমী সাধনার পথ সৃষ্টি হয়েছে। তবে বাংলার বাউল সাধনার সর্বোচ্চ বিকাশ দেখি সতেরশ শতকে। ফকির লালন শাহের মধ্যে। বাউল লালনই বাউল সাধনার শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার।’ লালন নিছক মরমী সাধক বা আধ্যাত্মবাদী ছিলেন না। জীবন আচরণে, গানে ও চিন্তায় ইহজগতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। তার সারাজীবনের পথচলার আগাগোড়াই ছিল জাত-পাতবিরোধী, ধনী-নির্ধন বিরোধী। লালনের গানে মানবিকতা, অসামপ্রদায়িকতা, সমাজবাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তার দর্শনের যে প্রতিফলন দেখা যায় তা দেশকালের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বমানবিক মূল্যবোধের পরিচয় তুলে ধরে। লালন তাই কেবল বাঙালি মরমী কবি বা গীতিকবিদের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বিশ্ব লোকসংস্কৃতির অঙ্গনেও তার অবস্থান অনেক উঁচুতে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে জাত-ধর্মের বাহ্যিক আচরণ ও ব্যক্তির সামপ্রদায়িক মনোভাবের বিরুদ্ধে লালন ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তার গান জাত-পাতের বিরুদ্ধে মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়। গানে তিনি বলছেন: ‘একই ঘাটে আসা যাওয়া, একই পাটনি দিচ্ছে খেওয়া কেউ খায় না কারও ছোঁয়া বিভিন্ন জল কে কোথায় পান\’ ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে লালন খারিজ করে দিয়েছেন। লালন তার অনুসারীদের নিয়ে নির্জনে বসে শুধু সাধনায় লিপ্ত ছিলেন না তিনি। বাউল শুধু আত্মমুখী সাধনায় নিয়োজিত থাকেন না। সামাজিক ভূমিকা পালনের কর্তব্যও তার রয়েছে। যা দেখি লালনের মাঝে। তিনি বলেন, একজন নিরক্ষর, গ্রাম্য জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি যার নেই, তিনি বলছেন বিদ্রোহের কথা, প্রতিষ্ঠানবিরোধী কথা, বলছেন মানুষের সহজ জীবনযাপনের কথা-এ ভাবা যায় না। অথচ তিনি গানের বাণীতে, হাতে-কলমে দেখিয়ে গেছেন কিভাবে সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। ঠাকুর পরিবার ও লালন লালনকে নগর জীবনে তুলে আনার পেছনে ঠাকুর পরিবারের বড় অবদান রয়েছে—বলছিলেন লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের শিষ্যদের মাধ্যমে লালন প্রসঙ্গে জেনেছেন। তার গানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের কত বড় ভক্ত ছিলেন তা বোঝা যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছন্দ’ নিয়ে তার দেয়া বক্তৃতায়। তিনি সেখানে লালনের গান ও তার শব্দচয়ন নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।’ ম. মনীরুজজামান বলেন, লালন সাঁইয়ের প্রথম ছবি আমরা পাই ঠাকুর পরিবারের জ্যোতিরিন্দ্র ঠাকুরের কাছ থেকে। ৫ মে ১৮২৯; ২৩ বৈশাখ ১২৯৬ আঁকা সেই স্কেচ আমাদের কাছে লালনের প্রথম দর্শন দেয়া। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের দেখা হয়েছে কিনা এ নিয়ে লালনের প্রথম জীবনী লেখক বসন্তকুমার পাল রবীন্দ্রনাথকে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন লালনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল কিনা। তখন রবীন্দ্রনাথ চিঠির উত্তরে বলেছিলেন, ‘তিনি ফকির সাহেবকে জানতেন। কিন্তু সেই স্মৃতি ধূসর।’ কাঙাল হরিনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলা দেবী, সতীশচন্দ্র দাস, করুণাময় গোস্বামী, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, মতিলাল দাশ, খোন্দকার রফিউদ্দীন—মূলত এরাই লালনের গানের সংগ্রাহক। তবে ঠাকুর পরিবারের বেশ কয়েকজন লালনকে নগর জীবনে মেলে ধরেছেন। নাগরিক সমাজে লালনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের প্রথম স্কেচ করেন। ইন্দিরা দেবী লালনের গানের প্রথম স্বরলিপির রচয়িতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের ২০টি গান পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। ঠাকুর পরিবারের বিশেষ আগ্রহের কারণেই নাগরিক সমাজ লালনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, রবীন্দ্রনাথ যেসময় গীতাঞ্জলির গানগুলি লেখেন তখন অধিকাংশ সময় শিলাইদহে ছিলেন। লালনের গানের সঙ্গে গীতাঞ্জলির গানের ভাবে, ভাবনায় মিল দেখা যায়।’ লালনের জীবন ফকির লালনের জীবন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। অনেকের মতে, তার জন্মস্থান তত্কালীন যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে। লালন শাহের জাত বা সম্প্রদায় নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। লালন নিয়ে অসংখ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তবে সেখানেও একেকজন গবেষক একেক কথা বলেছেন। কথিত আছে যে, তিনি হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ১৭৭২ সালে। আর মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর। লালনকে নিয়ে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে বসন্তকুমার পালের ‘মহাত্মা লালন ফকির’। এ গ্রন্থে লেখক বলেছেন, ‘লালনের জন্ম সাবেক নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত কুমারখালী থানার চাপড়া-ভাঁড়ারা গ্রামে হিন্দু কায়স্থ কূলে। তার বাল্যনাম লালন কর। পিতার নাম মাধবচন্দ্র কর। এছাড়া বিতর্ক রয়েছে তিনি হিন্দু না মুসলমান এ নিয়েও। কারও মতে, লালন কায়স্থ পরিবারের সন্তান, যার পিতা মাধব এবং মাতা পদ্মাবতী। পরে লালন ধর্মান্তরিত হন। গবেষকদের মতে, বেশিরভাগই মনে করেন লালন মুসলিম তন্তুবায়ী পরিবারের সন্তান। লালন ফকির নিজের জাত-পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ শিশুকালেই লালন শাহ তার পিতাকে হারান। বিয়েও করেন বেশ অল্প বয়সে। কোন কাজে তিনি গ্রামের বাইরে থাকা অবস্থায় লালন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। দৈবক্রমে বেঁচে যান লালন। এসময় তার পরিচয় হয় গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে। লালন গ্রামে ফিরে এলে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ তাকে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলতে দেয় না। লালন ফিরে আসেন সিরাজ সাঁইয়ের কাছে। পরে তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারি তারুক বিরাহিমপুরের ছেঁউড়িয়ায় তার আখড়া গড়ে তোলেন। ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে ফকির লালন আমৃত্যু সেখানেই বাস করেন। বাংলা ১২৯৭ সনের পহেলা কার্তিক, ইংরেজি ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন সাঁই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাঁইজির তিরোধানের পর থেকে ভক্ত শিষ্যবৃন্দ প্রতি বছর পহেলা কার্তিক কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়া আখড়া বাড়িতে স্মরণোত্সব পালন করে থাকেন। প্রথমে দিনব্যাপী হলেও পরবর্তী সময়ে তিনদিন ও বর্তমানে পাঁচ দিনব্যাপী উত্সব পালিত হয়।