সৌরভ শুভ
‘খুম’ শব্দের অর্থ জলাধার। প্রাকৃতিকভাবে জল ধরে আছে যেখানে সেটাই খুম। বান্দরবানের থানচি উপজেলার অন্তর্গত নাক্ষিয়ং এমন একটা জায়গার নাম যেখানে খুম দেখতেই মানুষ ছুটে যায়। পাড়ি দেয় পাহাড়ের পর পাহাড়। দিনের পর দিন দুর্গম পাহাড়ে ট্রেক করে সেই খুমে পৌঁছায়। কী এমন আছে এই খুমে!
বান্দরবান জেলা পুরোটাই পাহাড়ি অঞ্চল। থানচি হলো এই জেলার মায়ানমার সীমান্তঘেঁষা একটি উপজেলা। মার্মা শব্দ থাইন চৈ বা বিশ্রামের স্থান থেকে থানচি নামের উত্পত্তি।
থানচির নাক্ষিয়ং ট্রেইলকে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গম ট্রেইল বলা হয়। বহুকাল ধরে অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে ছুটে গেছেন নাক্ষিয়ং খুম নামের এই স্বর্গ দেখতে। থমকে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে ভেবেছে, এ কোথায় এলাম আমি! এটা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হতে পারে! নিজ চোখে না দেখে কে বিশ্বাস করবে আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশের এক কোণে পড়ে আছে প্রকৃতির এমন রূপ।
গহীন অরণ্যে ঘেরা নাক্ষিয়ং ট্রেইলে ট্রেক করা আর আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম, নাফাখুম দর্শন করার ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের। খুলনায় থাকার কারণে দেশের অপরপ্রান্তে থাকা এই ট্রেকিং আয়োজন বারবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এই ট্রেকিং-এ গ্রুপ দরকার হয়। তাই যখন সময় হয় তখন গ্রুপ করা হয়ে ওঠে না। যখন গ্রুপ উদ্যোগ নেয় তখন সময় থাকে না টাইপ বিপত্তি পার হতে হতে গত ডিসেম্বরে সুযোগ এসেই গেল।
একটি ৩ দিনের মডারেট প্রেকিং প্ল্যান করা হলো, যেটা শুরু হবে ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে থেকে। গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ৯ জন। চট্টগ্রামের টিপু ভাই তার গ্রুপ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে সব খোঁজখবর তথা জিপ, গাইড, বোট বুক করা ইত্যাদি ব্যবস্থা করতে লাগলেন। যেহেতু আমি খুলনা থেকে যাচ্ছি তাই আমার ভ্রমণ পরিকল্পনা বাকিদের থেকে ২ দিন বেশি। আমি ১৬ তারিখ বিকেলে রওনা হলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। ১৭ তারিখ সকালে চট্টগ্রামে নেমে সন্ধ্যায় বান্দরবানগামী বাসে উঠে পড়লাম। বাসে উঠেই পরিচয় হলো আমার বাকি গ্রুপেরমেটদের সাথে। এর মধ্যে একমাত্র সাজু দা’র সঙ্গে দু-বার সুন্দরবন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। বাকিরা তখন পর্যন্ত অপরিচিত ছিল।
পরিচিত হতে আর কত সময়! তারপর আড্ডা, গল্প, গান, সেল্ফি, আর কিছুটা ঘুম সাথে নিয়ে ৮/৯ টার দিকে পৌঁছে গেলাম পার্বত্য জেলা শহর বান্দরবান। ভোর ৫টায় আমরা রওনা দেবো।
জিপ সাঁই সাঁই করে এগুতে লাগলো থানচির উদ্দেশ্যে। ইচ্ছে ছিল নীলগিরি গিয়ে সূর্যোদয় দেখা। সূর্য্য মামার সাথে দৌড়ে না পেরে চিম্বুক পাহাড়ের ভিউপয়েন্টে জিপ থামানো হলো। নিস্তব্ধ রাত শেষে কুয়াশায় ঢাকা সারিসারি পাহাড়গুলো সবে ভোরের আলো পেয়ে ঘুম ভেঙে উঠছে। থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলাম কতক্ষণ জানি না। চোখ তার জন্য এমন দৃশ্য দেখে পলক ফেলতেই ভুলে গেলাম।
চিম্বুকের পালা শেষ করে আবার রওনা। পথে বিজিবি চেকপোস্টে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে চারপাশে পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম সীমান্ত উপজেলা থানচি। পৌঁছে দেখা হলো আমাদের গাইড হাসানের সাথে। ফ্রেশ হয়ে চা পর্ব সারতে সারতে আরেক দফা ট্রেকিং-এর অনুমতির কাগজপত্র রেডি করা হলো। বিজিবির অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাঙ্গু নদীর দিকে, যেখানে অপেক্ষা করছে বোট যা আমাদের নিয়ে যাবে পদ্মমুখ।
শীতকাল হওয়াতে সাঙ্গুতে পানি অনেক কম। মনে হলো পানি কম থাকলেই সাঙ্গুর সৌন্দর্য ঠিকঠাক ফুটে ওঠে। ৫ জন করে ২টি নৌকাতে চেপে বসতেই দেখলাম থানচির বড় ব্রিজটা দূরে সরে যাচ্ছে দ্রুত। আধঘণ্টা পর আমরা হাজির হলাম পদ্মমুখ। বোট ছেড়ে শুরু হলো আমাদের পথচলা। তখন দুপুর ১২টা, আর সেই যে চলা শুরু হলো আর থামেনি ৩ দিনে।
ধীরে ধীরে জঙ্গলে ঢুকছি আর অনুভব করতে পারছি এ জগত্ আমার না। আমি এখানে অনুপ্রবেশকারী। এই জগত্ অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি নিবিড়। এই প্রকৃতি অনেক বেশি প্রাকৃতিক। এটা ইট-কাঠের মিথ্যে জগত্ না। এটা পাহাড়, ঝিরি আর সবুজ অরণ্যে ঘেরা একটা সত্যি জগত্। মুগ্ধ হয়ে গায়ে মেখে নিচ্ছি বন্য নিস্তব্ধতা আর এগিয়ে চলেছি আমাদের আগামী ২ রাতের ঠিকানা থুইসাপাড়ার দিকে। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর প্রথম যে পাড়াটা পড়ল সেটার নাম রেনাজুন পাড়া। এখানে প্রতি পাড়াতেই রয়েছে ছোটখাটো দোকান। দোকান থেকে ডিম, পাহাড়ি কলা আর চা খেয়ে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে আবার চলা শুরু। একের পর এক ঝিরিপথ আর পাহাড় পেরিয়ে বিকেল ৩টার দিকে আমরা পৌঁছালাম হরিশ্চন্দ্র পাড়া।
একটা অনুষ্ঠান জাতীয় কিছু হচ্ছে দেখে এগিয়ে গিয়ে বুঝলাম একজন ব্যক্তির শেষকৃত্যের উদ্দেশ্যে এই লোকসমাগম। পাহাড়ি আদিবাসীদের নিজস্ব রীতির এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে আবারো বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা হওয়ার আগে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে যে! ক্লান্ত হয়ে চলেছি, কিন্তু পথ শেষ হয় না।
বিকেল ৫টার সময় আমরা যেখানে এসে পৌঁছালাম সেটার নাম নতুন পাড়া। ততক্ষণে পা আর কথা শুনছে না। এদিকে আকাশে মেঘ জমেছে। যদি বৃষ্টি হয় তাহলে পাহাড়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আশঙ্কা সত্যি করতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। তড়িঘড়ি করে নাস্তা করে আবারো বেরিয়ে পড়লাম, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। দূরে আবছা থুইসা পাড়া দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম রাতেও ট্রেক রতে হবে!
কিন্তু বৃষ্টি বাঁধ সাধলো না তেমন। দীর্ঘ সাড়ে ৬ ঘণ্টায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার পথ ঝিরি আর পাহাড় বেয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম থুইসা পাড়ায়। পাড়ার লোকজন, সোলার লাইটের আলো এসব দেখে মনে হলো যেন এ যাত্রা বেঁচে গেছি। আমাদের জন্য বরাদ্দ করা টংঘর দেখিয়ে দিলো আমাদের গাইড। আমাদের ৯ জনের জন্য যথেষ্ট বড় একটা ঘর, অনেকগুলো বালিশ আর কম্বল রাখা আছে আগে থেকেই।
রাতে বেশ বৃষ্টি শুরু হলো। পরদিন আমাদের কাঙ্ক্ষিত নাক্ষিয়ং ট্রেইলে ট্রেকিং। মাঝে পড়বে দেবতার পাহাড় যা এমনিতেই পাড়ি দেওয়া দুঃসাধ্য, আর যদি বৃষ্টি হয় তবে অসম্ভব প্রায়। গাইড বললো যদি ভোর রাতে বৃষ্টি হয় তবে ভুলে যান নাক্ষিয়ং। সারাদিন এখানে বসেই কাটাতে হবে!
রাতের প্রথমভাগে বেশ বৃষ্টি হলে আমরা ভাবলাম ভাগ্য বুঝি সত্যিই সহায় নেই। তবে শেষ রাতে বৃষ্টি হলো না। ভোরে উঠে আমরা যেতে উদ্যোগী হলে আমাদের গাইড দু’জন স্থানীয় ছেলেকে সঙ্গে দিলো গাইড হিসেবে। নাক্ষিয়ং-এ যেতে স্থানীয় গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাদের নিয়েই রওনা দিলাম আমরা।
পুুরু কুয়াশার চাদরে মোড়া পাহাড়গুলো দেখতে টিভি স্ক্রিনে দেখা অন্য কোনো দেশের দৃশ্যই মনে হয়। হাঁটতে হাঁটতে যখন হাঁসফাঁস করে উঠি তখন একটু দাঁড়িয়ে এই বিশাল পাহাড়ি অরণ্যের মাঝে নিজের অস্তিত্বকে একটু উপভোগ করে নিই। মনের ভেতরে একটাই বাক্য ঘুরে ফিরে তখন ‘এ আমি কোথায়!’
একটা পাহাড় ডিঙানোর পর আমরা দেবতার পাহাড়ের চূড়ায় এসে পৌঁছাই। এটার থেকে এবার নামতে হবে আমিয়াখুমসহ আরো ২টা খুম দেখতে। দেবতার পাহাড়ের গহীন জঙ্গলটা পার হতে হতে মনে পড়ে যাচ্ছিল জেমস রোলিন্সের আমাজনিয়া বইটার কথা, আর নিজেকে নাথান র্যান্ডের সাথে তুলনা করে রোমাঞ্চকর একটা ভাব মনে আনার লোভ সামলাতে পারিনি।
এসব ভাবতে ভাবতে আমরা পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের নিচে। অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে আছে নাক্ষিয়ং খুম। দু-পাশে উঁচু পাহাড়, তার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে খুমটা। খাঁজকাটা ধুসর কালো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সচ্ছ সবুজাভ জলের ধারা চলে গেছে যতদূর চোখ যায়। সামনে যে দৃশ্য তার বর্ণনা করতে সুনীল গাঙ্গুলিকে প্রয়োজন। আমার পক্ষে সম্ভব না। খুমের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ভেলার কাছে এলাম যেখান থেকে ভেলাখুমে যাবো। দুটি ভেলায় আমরা চড়ে বসলাম খুমের বুকে।
মুগ্ধ হতে হতে শরীর-মন ক্লান্ত যেন! শীতকাল হওয়াতে ভেলাখুমের জলপ্রপাতে তেমন পানি নেই। কিছু সময় কাটিয়ে আবার ঘুরে চলা আমিয়াখুমের দিকে। এক বিশাল জলপ্রপাত আমিয়াখুম। বিরাট শব্দে জল পড়ে চলেছে অবিরাম গতিতে। ভাবলাম শীতকালেই এমন, না জানি বর্ষায় এটা কী রূপ ধারণ করে! ট্রাইপড বের করে ক্যামেরা বসিয়ে দিলাম। আমিয়াখুমের পারফেক্ট একটা ছবি না নিলে কী চলে! এদিন আমিয়াখুমে আমরাই ছিলাম একমাত্র গ্রুপ।
আমিয়াখুমের পাশেই সাতভাইখুম। ভেলায় করে রওনা দিলাম সেটার উদ্দেশ্যে। শীতে জল কমের কারণে সাতভাইখুমের শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। আমরা কিছুদূর ভেলায় ঘুরে ফিরে এলাম! আবার দেখতে আসার বাসনা নিয়ে ফিরতে হলো নিজের আবাসস্থলে!
ছবি :লেখক
