বরিশালে অবাধে মা ইলিশ নিধন

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫০
ইলিশ প্রজনন মৌসুম হিসাবে সরকার ১৩ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনাসহ উপকূলীয় মত্স্য অভয়ারণ্যগুলোতে সব ধরনের জাল ফেলা, মাছ ধরা, পরিবহন ও ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করা সত্ত্বেও প্রশাসন ও মত্স্য কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় বরিশালের নদ-নদীতে চলছে অবাধে মা ইলিশ নিধন। বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ নিধনের অভিযোগে গতকাল শনিবার ১৮ জেলেকে জেল জরিমানা দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাছ ধরার সময় গতকাল মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন নদী থেকে এদেরকে আটকের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৬ জনকে ৩ মাস সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ জনকে ৩ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে ১ মাস কারাদণ্ড প্রদান করেন। গত ১৩ অক্টোবর থেকে নদীতে মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন নদী ও মোহনায় ইলিশ ধরা অব্যাহত রেখেছে এক শ্রেণির জেলেরা। মেহেন্দিগঞ্জের কালাবদর, ইলিশা ও মাছকাটা নদীতে অভিযান চালায় পুলিশ ও কোস্ট গার্ড।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তেঁতুলিয়া ও সন্ধ্যা নদীতে প্রকাশ্যেই চলছে ইলিশ নিধন। জেলেরা নৌকা ও ট্রলারযোগে প্রতিদিন দিন-রাত মাছ শিকার অব্যাহত রেখেছে। তবে প্রকাশ্যে মোকাম কিংবা হাট-বাজারে তা বিক্রি করা হচ্ছে না। সূত্রমতে, বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন সংলগ্ন মেঘনার শাখা তেঁতুলিয়া নদীতে অবাধে ইলিশ নিধন করা হচ্ছে। যা ভেদুরিয়া এলাকার রাস্তার মাথা নামকস্থানে বসে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, উজিরপুর ও বাবুগঞ্জ উপজেলার সন্ধ্যা নদীর সিলনদিয়া, ভাঙ্গারমুখ ও চরজাহাপুর এলাকায় নদীতে ইলিশ শিকার চলছে। এদিকে গত শুক্রবার রাতে কোষ্টগার্ডের সদস্যরা মেঘনা নদীতে অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়ার সময় চার পুলিশ সদস্যকে আটক করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযানে নেতৃত্বদানকারী গৌরনদী উপজেলা সহকারী মত্স্য কর্মকর্তা আমির হোসেন জানান, তারা মেঘনা নদীর সাহেবেরহাট, লাহারহাট ও সেলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছেন। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে জেলেরা ট্রলার ও নৌকাযোগে পালিয়ে গেলেও নদী থেকে তারা প্রায় ১৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করেছেন। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় দশ লক্ষাধিক টাকা। জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ওয়াহেদুজ্জামান জানান, আইন অমান্য করে নদীতে মাছ ধরার দায়ে সদর উপজেলার তিন জেলের বিরুদ্ধে মামলা ও এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে ২৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা মূল্যের এক লাখ ৫৭ হাজার ১’শ মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করা হয়েছে। জেলার দশটি উপজেলায় ১০টি মোবাইল কোর্টের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বানারীপাড়ায় নাম মাত্র মূল্যে ইলিশ বিক্রি! বানারীপাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, জেলায় সন্ধ্যা ও এর শাখা নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের মহোত্সব চলছে। প্রকাশ্যে সন্ধ্যা নদীর বানারীপাড়ার ইলুহার, কাজলাহার, ব্রাহ্মণকাঠি, নলেশ্রী, দিদিহার, চাউলাকাঠি, কালিরবাজার, জিরারকাঠি, মিরেরহাট নদীতে মা ইলিশ শিকার করা হচ্ছে। দিনের বেলা কিছুটা কম শিকার করা হলেও রাত নামলেই শিকারের মহোত্সবে মেতে ওঠে জেলেরা। প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সরকারি নেতাদের মদদে জেলেদের পাশাপাশি এলাকার যুবকরাও মাছ শিকারে নামছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও শাসকদলের নেতারা শিকার করা ওই মাছ বিক্রির টাকার কমিশন পাওয়ার পাশাপাশি মাছের একটি অংশ নিয়ে থাকেন। এদিকে জেলেরা বাজারে ইলিশ বিক্রি নিষিদ্ধ থাকায় গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফেরি করে মাত্র ২/৩শ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। প্রশাসন অভিযানে নামার আগেই রহস্যজনকভাবে জেলেরা মুঠোফোনে খবর পেয়ে যায়। ফলে বেশিরভাগ অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অভিযানে উদ্ধার হওয়া ইলিশ ভাগবাটোয়ারা ও টাকার বিনিময়ে জাল ছেড়ে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে ১১ জেলে আটক দৌলতপুর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে গত শুক্রবার রাতে যমুনা নদী থেকে ৬০ কেজি মা ইলিশ ও দেড় হাজার মিটার জালসহ ১১ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইরিন পারভীনের পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক বত্সরের কারাদণ্ড প্রদান করে। এ বিষয়ে উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন জানান, ১৩--২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রজননের জন্য মা ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও আটককৃত জেলেরা তা অমান্য করে মা ইলিশ ধরছে। পুলিশ প্রশাসন ও উপজেলা মত্স্য অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে যমুনা নদীতে এ অভিযান পরিচালিত হয়। পরে আটককৃত ইলিশ দুঃস্থ গরীব ও সাধারণ জনগণের মাঝে বিতরণ করে দেয়া হয়। মেঘনা থেকে কারেন্ট জাল ও মা ইলিশ উদ্ধার মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে গজারিয়া উপজেলার চর বলাকী এবং এর আশপাশ এলাকা থেকে শনিবার সকালে ১ লাখ ৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল এবং ২০০ পিস মা ইলিশ আটক করেছে কোস্টগার্ড। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং মা ইলিশ আটক করলেও এ সময় কাউকে আটক করতে পারেনি। স্বরূপকাঠিতে ৩ জেলের জেল স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শুক্রবার মধ্যরাতে স্বরূপকাঠিতে ইলিশ শিকারের অপরাধে সুমন, হাসান ও সুলতান নামে ৩ জেলেকে ১ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ফারক হোসেন এবং ফারুক মিয়াকে ১ হাজার টাকা করে জরিমানা আদায় করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মিজানুর রহমান। মনপুরায় মা ইলিশ নিধনের মহোত্সব মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, মনপুরার মেঘনায় রাতের আঁধারে মা ইলিশ নিধনের মহোত্সব চলছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটি প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে জেলেরা মেঘনায় মা ইলিশ নিধন করে যাচ্ছে। রাতের বেলায় অভিযান চালানোকে প্রশাসনের আইওয়াশ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। একশ্রেণীর জেলে মাছ ধরছে আর সেই মাছগুলো কিছু অসাধু মত্স্য ব্যবসায়ী স্বল্পমূল্যে কিনে নিচ্ছেন। অভিযানে আটক জেলেদের জরিমানা দিয়ে ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে তবে কোন জেলেদের জেল দেয়া হয়নি। প্রতিটি মাছই বড় ধরনের এবং প্রতিটি মাছের পেটেই ডিম রয়েছে। এসব মা ইলিশগুলো সাগর থেকে ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে এসে জালে ধরা পড়ছে। দিনের বেলায় তেমন একটা মাছ ধরতে দেখা যায় না। তবে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর রাত পর্যন্ত মেঘনায় জাল ফেলে একশ্রেণীর জেলে মাছ শিকারে ব্যস্ত। এছাড়া বেশির ভাগ মাছই নদীর মধ্যে বেচাকেনা সম্পন্ন হয়। কিছু সংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ী নদীর মাঝে অবস্থিত চরের পাশে নোঙ্গর করে অবস্থান নেন। জেলেরা সেখানে গিয়ে মাছ দিয়ে যায়। এছাড়া কিছু মাছ লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে মাছ বরফজাত করে রাখা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে সংরক্ষিত সেসব মাছ ঢাকায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।