নাগরিক অভিমত

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫৯
রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণার ঘটনায় বর্তমান পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করবে। এ অভিমত নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনদের। তারা এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার প্রস্তাবের পর সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা স্ববিরোধিতা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, এ থেকে মনে হয় সরকার নিপীড়নমূলক মনোভাব নিয়ে এগুচ্ছে। অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যর আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, এ সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করেছে। আজ রবিবার ভোর ছয়টা থেকে ঢাকা মহানগরের মধ্যে সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন, লাঠি মিছিল ও অবস্থান অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল শনিবার ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশ দেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এ জন্য তিনি বিরোধী দলীয় নেতার কাছে বিরোধী দলের সাংসদদের নামও চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ঠিক একদিন পর সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিকরা। রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ইত্তেফাককে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এতো সুন্দর প্রস্তাব দেয়ার পর আমরা সবাই বিএনপির প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তার আগেই ঢাকা মহানগরে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত উচিত হয়নি। বিএনপি অনেক আগে থেকে ২৫ অক্টোবরের কর্মসূচি দিয়ে রেখেছিল। ফলে সবকিছুই এখন ঘোলাটে হয়ে গেল। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী আলোচনার প্রস্তাব দিলেন। এর মধ্যে ঢাকা শহরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত অনেকটা স্ববিরোধী। আগে থেকেই আমাদের আশংকা ছিল বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব ভালোভাবে নেবে না। তার মধ্যে ডিএমপির এই সিদ্ধান্ত বিএনপির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটা ঠিক হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ডিএমপির সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর দেখা বক্তব্যের পুরোপুরি স্ববিরোধী। প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হলো। সরকার নিপীড়নমূলক মনোভাব নিয়ে এগুচ্ছে। ডিএমপির সিদ্ধান্তকে দুঃখজনক বলে আখ্যা দেন তিনি। নাগরিক ঐক্যর আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ডিএমপির সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে আমি বিস্মিত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের কথা বলার পর এ ধরনের সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক। সভা-সমাবেশ নিধিদ্ধের মতো কোন পরিস্থিতি হয়নি। এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শওকত আরা হোসেন বলেন, রাজধানী মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ বর্তমান পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করলো। সরকারকে আরো ধৈর্যের পরিচয় দেয়া উচিত ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একাধিক কারণে ডিএমপির এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রাজনীতিতে সংকট উত্তরণের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা রুদ্ধ হলো। প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাবের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। এই সিদ্ধান্তের মূলে বিএনপির ২৫ অক্টোবরের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে। তাহলে সরকার ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত ? তাদের হাতে নেতিবাচক অস্ত্র তুলে দেয়া হলো। তিনি আরো বলেন, সভা-সমাবেশ প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। আবার সংবিধানেই সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের বিষয়টি নির্দিষ্ট করা আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ না করে, বিএনপির সমাবেশে দা-কুড়াল না আনার আহবান করতে পারত ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. মো ঃ মিজানুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কাম্য নয়। আলোচনার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্তের ফলে তা বন্ধ হলো। সরকার গণতান্ত্রিক মনোভাব না দেখালে বর্তমান পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।