পদক্ষেপটি সম্পূর্ণরূপে বেআইনী ও অসাংবিধানিক এবং অত্যন্ত পরিষ্কারভাবেই উস্কানিমূলক। দেশের সংবিধান যেখানে নাগরিকদের সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠান তথা বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, সেখানে কোনো অজুহাতেই অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজধানীতে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলসহ সবধরনের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী চলমান সংকট উত্তরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। কারণ, তারা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কার্যত জনগণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারকেই অস্বীকার করেছে। মাত্র একদিন আগে জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পটভূমিতে বিরোধী পক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হওয়ার আগেই এ ধরনের একটি পদক্ষেপ নি:সন্দেহে সরকারের দ্বিমুখী নীতিকে স্পষ্ট করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শুক্রবার তাঁর ভাষণে যেটুকু ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে, মাত্র ১৬ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে গতকাল তাঁর সরকারেরই গৃহীত একটি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ সেটাকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সন্দেহ নেই যে, ক্ষমতাসীনদের এই অসহিষ্ণু আচরণ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান আস্থার সংকটকে আরও তীব্র করে তুলবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দলের সেই সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করার দায়িত্বও সরকারের। পুলিশ বা রাষ্ট্রের অন্য কোনো সংস্থা ইচ্ছে করলেই বিরোধী দল তথা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করতে পারে না। আর এ কথা সবারই জানা যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক এ ধরনের বেআইনী পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকে মূলত ক্ষমতাসীন মহলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। সুতরাং সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাসীনদের। এ পর্যায়ে বিরোধী দলের সমাবেশ-কর্মসূচির বিপরীতে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে এক ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির পটভূমি তো সরকারই তৈরি করেছে। সুতরাং যে আশঙ্কার প্রেক্ষাপট সরকার নিজেই রচনা করেছে, সেই আশঙ্কার ভিত্তিতে অন্যের অধিকার হরণের পেছনে আর যাই থাকুক, কোনো সত্ উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। তা সত্ত্বেও পুলিশের কাছে যদি কোনো ধরনের সংঘাত-পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে, তাহলে তারা সমাবেশের এলাকা সীমাবদ্ধ করে দিয়ে নিবিড় নজরদারির ব্যবস্থা করতে পারতো। কথিত সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কায় রাজনৈতিক অসত্ উদ্দেশ্যে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের রেওয়াজ একবার চালু হয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে তা গণতান্ত্রিক রীতি-পদ্ধতিকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
