পূবের আকাশে যখন সুবেহ্ সাদেক উঁকি দিচ্ছিল তখনই এই সুন্দর পৃথিবীতে জন্ম হল আমার। আমাদের পশতুনদের বিশ্বাস, এটা খুব শুভ লক্ষণ। কিন্তু আমার জন্মের খবরে খুশি হল না গ্রামের কেউ। সবাই আমার আম্মুকে সহানুভূতি জানাল এবং কেউই আমার আব্বুকে অভিনন্দন জানাল না। আমার আম্মুকে হাসপাতালে পাঠানোর মত বা ধাত্রী রাখার মত পয়সা ছিল না আব্বুর। একজন প্রতিবেশীই এসে সাহায্য করেছিলেন আমার আম্মুকে। আমার আম্মুর প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় মৃত অবস্থায়। কিন্তু আমি জন্মেই নাকি খুব চ্যাচাচ্ছিলাম আর হাত-পা ছুঁড়ছিলাম। আমি এমন এক এলাকায় কন্যা হিসাবে জন্মগ্রহণ করলাম যেখানে পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে রাইফেলের গুলি ছুঁড়ে আনন্দ করা হয় আর কন্যা সন্তান জন্মালে লুকিয়ে রাখা হয় পর্দার আড়ালে। রান্নাবান্না করা আর সন্তানের জন্মদান ছাড়া সমাজে মেয়েদের আর কোন কাজ নেই। কন্যা সন্তান জন্মালে বেশিরভাগ পশতুনেরই মন খারাপ হয়ে যায়। শুধু একজন আমার জন্মের খবরে খুশি হলেন। এমনকি মোটা অংকের একটা টাকাও উপহার দিলেন। তিনি আমার আব্বুর এক জ্ঞাতি ভাই। তিনি হলেন জেহান শের খান ইউসুফজাই। তিনি আমাদের পরিবারের একটা বংশলতিকা এনেছিলেন সঙ্গে করে। আমার প্রপিতামহ দালোখেল ইউসুফজাই থেকে বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত সমস্ত পুরুষের নাম তাতে পরপর লেখা ছিল। তবে আমার আব্বু জিয়াউদ্দিন পশতুন হলেও ভিন্ন চরিত্রের। তিনি সেই বংশলতিকায় তার নিজের নামের পর ললিপপের মত একটা লাইন টেনে তার শেষে লিখলেন ‘মালালা’। তার সেই জ্ঞাতি ভাই তা দেখে বিস্মিত হলেন। কিন্তু আমার আব্বু তাতে কোন পাত্তা দিলেন না। পরে আব্বুর মুখে শুনেছি, আমার জন্মের পর আমাকে দেখে, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি অভিভূত হয়ে পড়ে ছিলেন। তিনি তার পরিচিতদের বলতেন, ‘তোমরা দেখে নিও, এই মেয়ে ভিন্ন কিছু হবে।’ তিনি তার আত্মীয়-স্বজনকে আমার দোলনায় শুকনো ফল, মিষ্টি এবং টাকা রাখতে বললেন। আমাদের সমাজে এই রীতিটা কেবল পুত্র সন্তানের জন্য পালন করা হয়। কন্যারা এই মর্যাদা লাভের অধিকারী নয়।
আফগানিস্তানের মইবন্দে পাঠানদের ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মালালা বা মালালাই নামের এক মহীয়ষী নারী। পশতুনরা ছাড়াও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বহু উপজাতি এই বীর নারীকে নিয়ে গর্ববোধ করে থাকে। তার নামেই নাম রাখা হয় আমার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের বলা হয় পশতুনওয়ালী। আমাদের আতিথেয়তার সুনাম আছে। পশতুন সমাজে অতিথিকে সম্মান জানানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি। সম্মান হারানোই হল পশতুন পুরুষের জন্য সবচেয়ে খারাপ বিষয়। লজ্জার চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না তাদের জীবনে। বলা হয়ে থাকে, ‘ইজ্জত নেই তো তামাম দুনিয়া বরবাদ’। আমরা নিজেদের মধ্যে সারাক্ষণ ঝগড়া-বিবাদে মত্ত থাকি। এমনকি আমরা আমাদের জ্ঞাতি ভাই-বোনকে যে ‘তারবুর’ বলে ডাকি, তার মানেও হল শত্রু। অথচ বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা এক সঙ্গে লড়াই করি। সমস্ত পশতুন শিশুই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মালালাইয়ের বীরত্ব কাহিনী শুনতে শুনতে বড় হয়। ১৮৮০ সালে আফগান সেনাবাহিনীকে তিনি কিভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, কিভাবে ব্রিটিশদের পরাজিত করেছিলেন, তা মুগ্ধ হয়ে শোনে পশতুন শিশুরা, উজ্জীবিত হয় নতুন প্রেরণায়।
মালালাই ছিলেন মইবন্দের এক মেষপালকের কন্যা। মইবন্দে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি আফগান যোদ্ধাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমার প্রিয় তরুণ বন্ধুরা! মইবন্দের এই লড়াইয়ে তোমরা যদি যোগ না দাও; তবে আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি, তোমরা বেঁচে থাকবে লজ্জা ও কলঙ্কের প্রতীক হিসাবে।’ লড়াইয়ের সময় শত্রুদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন মালালাই; তবে তার সেই আহবান অনুপ্রাণিত করেছিল আফগান যোদ্ধাদের। ব্রিটিশদের একটা গোটা ব্রিগেডকে পরাস্ত করেছিল তারা। ব্রিটিশদের যুদ্ধের ইতিহাসে এই যুদ্ধ এক বড় পরাজয় হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই যুদ্ধে জয় লাভের পর আফগানরা এতোটাই গর্বিত হয়েছিল যে, আফগান রাজ কাবুলের কেন্দ্রস্থলে মইবন্দ বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। যখন হাইস্কুলে পড়ি তখন শার্লক হোমস পড়তে গিয়ে দেখি তাতে এই মইবন্দ যুদ্ধের উল্লেখ আছে। গোয়েন্দা চূড়ামণি শার্লক হোমসের সহকারী হিসাবে কাজ করার আগে ড. ওয়াটসন এই মইবন্দের যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে কাহিনীতে! আমার মত মেয়েদের কাছে মালালাই পশতুন জোয়ান অব আর্ক। এখনো আফগানিস্তানে বহু মেয়ের নাম রাখা হয় তার নামে। কিন্তু আমার নাম মালালা রাখাতে খুশি হননি আমার দাদা। তিনি ছিলেন গ্রামের একজন মৌলভি। তিনি বলতেন, ‘নামটা ভালো হল না। এটা দুঃখের নাম। এর মানে হল দঃখে নিমজ্জিত।’
যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন আব্বু প্রায়ই আমাকে একটা গান গেয়ে শোনাতেন। গানটা পেশোয়ারের বিখ্যাত কবি রহমত শাহ শায়েলের লেখা। গানটির শেষ কটি লাইন এরকম:
হে মইবন্দের মালালাই,
জেগে ওঠ আরবার।
জাগাও পশতুন বুকে
জয়গান জীবনের।
তোমার কবিতার যে বাণী
জ্বেলে ছিল আগুন দিকে দিকে,
সে বাণী শোনাও আবার....
