যক্ষ্মা হলেও রক্ষা আছে!

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৬
রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরে একটি ট্যানারিতে কাজ করেন শফিউল ইসলাম (২২)। কয়েক বছর আগে একজন যক্ষ্মা রোগীর সংস্পর্শে তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। কফ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হন যে তার যক্ষ্মা হয়েছে। এরপর প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তিনি স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সেবিকা আপার বাড়ি গিয়ে ওষুধ খেতেন। এভাবে ছয় মাস ওষুধ সেবনের পর তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ‘ডটস্’ (ডায়রেকটলি অবজার্ভ ট্রিটমেন্ট কোর্স) পদ্ধতির চিকিত্সায় শফিউলের মতো যক্ষ্মামুক্ত হয়েছেন এমন আরো অনেকেই। যক্ষ্মা অতি পরিচিত ও প্রাচীন সংক্রামক একটি রোগ। ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই’—এরকম নানা কুসংস্কার এ রোগ সম্পর্কে প্রচলিত থাকলেও ক্রমেই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। এখন মানুষ বুঝতে পারছে যে এ রোগ প্রাণঘাতী নয়। যথার্থ চিকিত্সায় এটি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। সরকার-এনজিও যৌথ কার্যক্রমে দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়েছে বলে জাতীয় যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, একজন যক্ষ্মা রোগী দশজনকে আক্রান্ত করতে পারে। ২০১১ সালের পরি-সংখ্যান আনুযায়ী, দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৬৪ জন। প্রতি লাখে রোগাক্রান্তের সংখ্যা ৪১১ জন। আর বছরে এই রোগের কারণে প্রতিলাখে ৪৫ জন মারা যায়। সাধারণত শহরের অভিজাত এলাকার চেয়ে বস্তি ও অজপাড়াগায়ে যক্ষ্মার প্রার্দুভাব বেশি। মূলত অপুষ্টি, অশিক্ষা, ঘনবসতি ও নিন্মমানের জীবন-যাপনের কারণে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জাতীয় যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’র লাইন ডিরেক্টর ডা. আশেক হোসেন জানান, এই রোগ নিরাময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘ডটস্’ পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালে সরকারের সাথে ব্র্যাকসহ আরো কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা এ ব্যাপারে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিশেষ করে যক্ষ্মা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় সরকার-ব্র্যাকের যৌথ কার্যক্রম অধিক আলোচিত বলে তিনি দাবি করেন। ওই উপজেলায় যক্ষ্মা পরিস্থিতি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে জানা গেছে, এ পর্যন্ত সেখানে ৭৬২ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সকলেই বর্তমানে ‘ডটস্’-এর আওতায় চিকিত্সাধীন রয়েছেন। এ সম্পর্কে সদর উপজেলা ব্র্যাকের ব্যবস্থাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সদর উপজেলার ২০টি ইউনিয়নে ব্র্যাক যক্ষ্মা নিরাময়ে কাজ করছে। রোগ শনাক্ত করার জন্য তাদের আছে ৭০টি ‘স্মেয়ারিং সেন্টার’। এই সকল সেন্টারে সপ্তাহে দুই দিন (সোম ও বুধবার) কফ পরীক্ষা করানো হয়। তিনি জানান, তিন সপ্তাহ একনাগারে কাশি হলে প্রথমে কফ পরীক্ষা করা হয়। যখন কফ ও এক্সরেতে ধরা না পড়ে, তখন চুল, নখ, দাত ব্যতীত শরীরের যে কোন স্থানে যক্ষ্মা শনাক্ত করা হয়। যক্ষ্মা শনাক্ত হলে ৬ মাসের ওষুধের কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। একদিনও যাতে ওষুধ না বাদ পড়ে তাই রোগীকে স্বাস্থ্য সেবিকার বাড়ি গিয়ে ওষুধ খেতে হয়। এই এলাকায় একজন স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়ন্ত্রণে ১০ জন সেবিকা কাজ করেন। উপজেলার ভাটপাড়া ইউনিয়নের সেবিকা মোসাম্মত্ রওশন আরা বেগম জানান, ২০০৩ সাল থেকে তিনি সেবিকার দায়িত্ব পালন করে এ যাবত্ প্রায় ২৫ জন যক্ষ্মা রোগীকে সারিয়ে তুলেছেন। তিনি আরো জানান, যখন তিনি প্রথম দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন অনেকে তিন সপ্তাহের বেশি কাশি হলে, যক্ষ্মা হতে পারে এই আশঙ্কায় বিষয়টি লুকিয়ে রাখতেন। তখন তাদের ধারণা ছিল পাপ বা অভিশাপের কারণে যক্ষ্মা হয়। আর যক্ষ্মা হলে তার কোন রক্ষা নাই। তখন বেগুনি অ্যাপ্রোন পড়ে, ছাতা আর ব্যাগ নিয়ে গ্রামে গ্রামে হেঁটে তিনি রোগী খুঁজে বের করতেন। তাদের বোঝাতেন এটা একটা রোগ, কোন অভিশাপ নয়। ছয় মাস নিয়মিত ওষুধ খেলে এই রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়। আর চিকিত্সা না করলেই বিপদ। রওশন জানান, এভাবে ক্রমেই পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। আজ দশ বছর পরে কারো তিন সপ্তাহের বেশি কাশি থাকলে সে নিজেই তাকে খুঁজে বের করেন ওষুধ নেয়ার জন্য। যদি কেউ ওষুধ খেতে না আসে তখন কি করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার বাড়ি গিয়ে ওষুধ খাওয়া নিশ্চিত করি। আর যক্ষ্মাক্রান্ত হলে জীবন-যাপনের বিধিও রোগীকে বলে দেই। তবে অবস্থাসম্পন্নরা তাদের মতো সেবিকার হাতে ওষুধ খেতে চান না বলে তিনি অভিযোগ করেন। যক্ষ্মা রোগ সংক্রমণ সর্ম্পকে ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, সাধারণত রোগাক্রান্ত হওয়ার দুই-তিন সপ্তাহ পর আর সংক্রমণ অবস্থা থাকে না। তখন রোগী স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন। জাতীয় যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’র লাইন ডিরেক্টর ডা. আশেক হোসেন বলেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে আমরা আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জন করেছি। সরকার যক্ষ্মা শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক স্ক্যানিং মেশিন দিচ্ছে। ওষুধেরও কোন অভাব নেই। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে চিকিত্সা ব্যবস্থা দেয়া হচ্ছে তাতে সকলের অধিকার রয়েছে এবং এটি মানসম্পন্ন। যক্ষ্মা রোগ সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন।