শাহাদত চৌধুরী যদিও একজন শিল্পকলার ছাত্র ছিল, কিন্তু তার খুব বেশি ইজেল পেইন্টিং নেই। তার পরও সে ছিল মহত্ শিল্পী। কারণ মানুষ যখন শিল্পী হয় তখন নানাভাবে তার বিকাশ ঘটে। এখন আমাদের দেশে দুই ধরনের শিল্পী প্রয়োজন। নান্দনিক চেতনার বিকাশ এবং নান্দনিক বোধ জাগিয়ে তোলা। এই নান্দনিক বোধ থেকেই শাহাদত চৌধুরী পরবর্তীতে নানা রকম কাজে লিপ্ত হয়েছিল। বিশেষ করে ‘বিচিত্রা’ ও ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় শুধু ঘটনার বিচরণ ছিল তা নয়, সেখানে মেধা ও মননের সমন্বয় আনতে পেরেছিল। নিজে শিল্পী বলেই এই নান্দনিক বোধটা তার মধ্যে ছিল এবং তার সম্পাদনার মধ্যেও সুন্দর, সুষ্ঠু পরিমতিবোধের দিকটি লক্ষ করা যায়।
একটি কথা সবাই বলে, ‘কোনো শিল্পীই দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না।’ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা বিভিন্ন জায়গায় চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করেছি এবং শত শত পোস্টার সারা রাত ধরে এঁকেছি। সে সময় আমরা কলকাতায় বিভিন্ন রকম আন্দোলন করেছি। শাহাদত তখন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। অত্যন্ত বলিষ্ঠ একজন মুক্তিযোদ্ধা। একটি স্বাধীন পতাকার স্বপ্ন পূরণে তার বিশাল অবদান রয়েছে। এ রকম হয়তো অনেকেরই আছে। আজকে শাহাদত চৌধুরীর সঙ্গে তাদেরও স্মরণ করছি। মুক্তিযুদ্ধের কথা তার কাছে অনেক শুনেছি। আমরা যখন দেশের ভেতর নানা রকম কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার কথা তার সঙ্গে আদান-প্রদান করতাম, তখন একটি কথা ওকেও বলতে শুনেছি এবং আবার কাজের মাধ্যমেও প্রমাণ পেয়েছি। তা হলো, তখন বাংলাদেশের মানুষ প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাকে সাহায্য করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গল্প সে যখন বলত, তখন আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। শাহাদত খুব সুন্দর করে সেসব গল্প বলত। আমি তাকে বলেছিলাম, তুমি এগুলো লিখতে শুরু কর। লেখাটা শুরুও করেছিল। আমি জানি না, লেখাটা শেষ করতে পেরেছে কি না। যদি শেষ করতে নাও পারে, তবুও যেটুকু লিখে যেতে পেরেছে সেটাই প্রকাশিত হওয়া দরকার। কারণ দেশের জন্য এর চেয়ে ভালো স্মৃতি আর কিছুই হতে পারে না। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার চাওয়া যে, তারা যেন শাহাদত চৌধুরীর মতো দেশকে ভালোবাসতে পারে। আমাদের জীবদ্দশায় একটি স্বাধীন পতাকা অর্জন করেছি এবং বাংলাদেশের মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত সেটা রক্ষা করা। যেমনভাবে একজন তরুণ শিল্পী অস্ত্র হাতে, লেখনীর মাধ্যমে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে হলেও স্বাধীনতা অর্জন এবং তা রক্ষা করার প্রজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। এ রকম একজন প্রাণোচ্ছল যোদ্ধাকে আমাদের তরুণ প্রজন্ম আজীবন মনে রাখবে। (অংশ)
সূত্র: শাহাদত চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ/সম্পাদনা : গোলাম মোর্তোজা (সময় প্রকাশন, ২০০৭)
