‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪২
আমাদের বাড়িতে যেই আসুক, আব্বু তাকে মালালাইয়ের ইতিহাস বলবেনই। আমিও সেই গল্প শুনতাম মুগ্ধ হয়ে। আমার আব্বু যখন সেই গানটি আমাকে শোনাতেন, শিহরণ জাগত আমার দেহ-মনে! এবং লোকে যখন আমাকে ডাকত, মালালা নামটা ভেসে বেড়াত বাতাসে—আনন্দে ভরে যেত আমার মন। যে এলাকায় আমাদের বাস, সেটা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর। আমাদের উপত্যকার নাম সোয়াত। সোয়াত উপত্যকা স্বর্গের মত। কাছে-দূরে ছোট-বড় পাহাড়। কুল-কুল শব্দে ঝর্ণা নামছে সে সব পাহাড়ের গা বেয়ে। কাক চক্ষুর মত স্বচ্ছ পানির হ্রদ ছড়িয়ে আছে এখানে সেখানে। এই উপত্যকায় প্রবেশের মুখেই বড় বড় করে লেখা ‘স্বর্গভূমিতে স্বাগতম!’ অতীতে এই সোয়াত উপত্যকার নাম ছিল ‘উদ্যান’। সংস্কৃত ভাষায় এই কথাটির অর্থ ফুলের বাগান বা বাগান। এখানে মাঠে মাঠে এতো রকমের, এতো বর্ণের বনফুল ফোটে, যা না দেখলে বিশ্বাস হতে চাইবে না। ফলের বাগানও আছে অনেক। নদীগুলোর পানি পান্নার মত স্বচ্ছ ও সবুজ। তাতে প্রচুর ট্রাউট মাছ। লোকে আমাদের উপত্যকাকে বলে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। পাকিস্তানের প্রথম স্কি রিসোর্টটাও আছে এখানে। পাকিস্তানে যাদের অনেক টাকা-পয়সা আছে, তারা প্রায়ই এখানে আসেন ছুটি কাটাতে। তারা কয়েক দিনের জন্য এখান থেকে বিশুদ্ধ বাতাস সেবন করে যান প্রাণভরে। এখানে যে সুফি উত্সব হয়, তার গান শুনতে আর নৃত্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লোক আসে প্রতিবছর। ইউরোপ থেকেও বহু লোক আসে। তাদের আমরা বলি ‘আংরেজান’। এর মানে হল ইংরেজ। ব্রিটেনের রাণীও এসেছেন এখানে। আমাদের রাজা সোয়াতের প্রথম ওয়ালি ব্রিটেনের রাণীর থাকার জন্য তাজমহলের আদলে শ্বেত মর্মর দিয়ে একটা প্রাসাদ বানিয়ে দিয়েছিলেন। সবাই সেটাকে বলে শ্বেত প্রাসাদ। সেই প্রাসাদেই কয়েকটা দিনের জন্য কাটিয়ে গিয়েছিলেন রাণী। আমাদের ইতিহাসেরও একটা বৈশিষ্ট্য আছে। বর্তমানে সোয়াত খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের অংশ। পাকিস্তানিরা একে বলে কে.পি.কে। তবে সোয়াত পাকিস্তানের অন্য এলাকার মত নয়। এক সময় আমাদের এই উপত্যকা ছিল নবাব শাসিত ভিন্ন রাজ্য। চিত্রল ও দির এর সঙ্গেই ছিল। ঔপনিবেশিক আমলে আমাদের রাজা ব্রিটিশ সরকারকে খাজনা দিতেন বটে; তবে তিনিই ছিলেন এই এলাকার রাজা বা শাসক। ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যায় তখন আমরা নবগঠিত পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হই বটে তবে এ এলাকা ছিল স্বায়ত্তশাসিত। আমরা পাকিস্তানের মুদ্রা ব্যবহার করতাম ঠিকই কিন্তু পাকিস্তান সরকার শুধু বৈদেশিক বিষয়েই আমাদের ওপর হস্তক্ষেপ করত। রাজা বা ওয়ালিই বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, উপজাতীয় গোত্রগুলোর মধ্যে শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করতেন। তিনিই প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা নিয়ে রাস্তা-ঘাট, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—এসব নির্মাণ করতেন। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে আমাদের এই উপত্যকার দূরত্ব খুব বেশি নয়। আকাশ পথে বড়জোর একশ মাইল হবে। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে এতো পার্থক্য যে, মনে হবে ভিন্ন দেশ। সড়ক পথে রাজধানীতে যেতে সময় লাগে ঘন্টা পাঁচেক। মালাখন্দ গিরিপথ পাহাড় দিয়ে ঘেরা বিশাল এক গামলার মত। বহুকাল পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষরা এই স্থানে মোল্লা সাইদুল্লাহর (ব্রিটিশরা তাঁকে বলত পাগলা ফকির) নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেই লড়াইয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন উইনিস্টন চার্চিল। এই লড়াই নিয়ে তিনি একটা বইও লিখেছিলেন। পরে এখানকার এক পর্বত শৃঙ্গের নাম তার নামেই করা হয়। যদিও এই এলাকার মানুষের কাছে তিনি মোটেও প্রিয় মানুষ নন তার পরও এই নামটা রয়েই গেছে। মালাখন্দ গিরি পথের শেষে আছে সবুজ গম্বুজ ওয়ালা এক মাজার। নিরাপদে গিরিপথটি পার হওয়ার জন্য লোকজন ধন্যবাদ জানিয়ে টাকা-পয়সা ছুঁড়ে দেয় সেই মাজারে। (চলবে)