মাদকাসক্ত পিতার নিষ্ঠুরতা

ফুটফুটে শিশু রিয়ার ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৬
নাম তার ইসরাত জাহান রিয়া। বয়স দুই বছর। এই বয়সেই মাদকাসক্ত পিতার চরম নিষ্ঠুরতায় দুই দুইবার বিক্রির শিকার হয়েছে। খালা ও আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় কুমিল্লার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর ঘরে মায়ের মমতায় বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলেও বাদসাধে সেই মাদকাসক্ত পিতা। রিয়ার পিতা শাহ সুলতান আদালতে গিয়ে মেয়েকে ফিরিয়ে আনার আর্জি জানালে আদালতের নির্দেশে শিশুটির জায়গা হয় আজিমপুরের সরকারি ছোট্টমণি নিবাসে। এখানে নেই তার সেই পালক মায়ের মমতা। অসহায়ের মত লোহার গেট ধরে সারাদিন তাকিয়ে থাকে অজানার পথে। শিশু রিয়া জানে না কী তা পরিণতি। জানা যায়, রিয়ার বাবা শাহ সুলতান স্ত্রীর কাছে বারবার যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকলে রিয়ার মা বাপের বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে তার হাতে টাকা তুলে দেয়। সে টাকাও মাদকের পেছনে খরচ করে টাকা রোজগারের পথ হিসাবে বেছে নেয় শিশু কন্যা রিয়াকে। নিঃসন্তান দম্পতির পরিবারের কাছে দুই দফা বিক্রি করে দেয় রিয়াকে। সেখান থেকেও তাকে ফিরিয়ে আনে। এরপর আবার বিক্রির ব্যবসায় নামতে যায় সুলতান। রিয়ার খালা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরামর্শে রিয়ার মা সাজেদা বেগম কাজল অবশেষে তাকে তুলে দেয় কুমিল্লার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর স্ত্রী কোহিনুরের হাতে। সেখান থেকে রিয়াকে ফিরিয়ে নিতে সুলতান আদালতে দারস্থ হওয়ায় বিচারক শিশুটিকে আজিমপুরে সরকারি ছোট্টমণি নিবাসে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। আজিমপুরের এই নিবাসে নেই তার পালক মায়ের মমতা। আইন অনুযায়ী তাকে ছোট্টমণি নিবাসে পাঠানোর নির্দেশ দিলেও বিচারকও বোঝেন শিশুটি তার পালক মা কোহিনুর ছাড়া অন্য কাউকে মেনে নেয়নি। তাছাড়া যে পরিবেশে রিয়া মাত্র এক বছরের মাথায় সুস্থ সবলভাবে বেড়ে উঠেছে সেই পরিবেশও ছোট্টমণি নিবাসে নেই। গত ৮ অক্টোবর রিয়াকে আদালতে হাজির করা হলে সে বারবার পালক মায়ের প্রতি তার আগ্রহ দেখায়। সমাজ কল্যাণ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আইনের ভাষায় যা হোক, শিশুটিকে যে পরিবেশে মানুষের মতো মানুষ হবে সেই পরিবেশে রাখা উচিত। এ ব্যত্যয় ঘটলে তার ভবিষ্যত্ জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া হবে বলে তিনি জানান। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকাসক্ত পিতার হিংস্র মনোভাবের কারণে রিয়ার মা কাজলও শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। সে নিজে বাঁচার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কোথায় বাঁচার ঠাঁই নিলে মাদকাসক্ত স্বামী হামলা চালিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে। কাজল জানায়, শিশুটি ৬ মাস বয়স থেকে দুই দফা নিঃসন্তান দম্পতির কাছে নিয়ে টাকা এনে স্বামীর হাতে তুলে দেয়। দুই পরিবারে শিশুটি মাত্র ৬ মাস ছিল। নানা কৌশলে ঐ দুই পরিবার থেকে শিশু রিয়াকে তারা পুনরায় নিয়ে আসে। মাদকাসক্ত স্বামী সর্বস্ব শেষ করে তারা বস্তি, ফুটপাতে ও বাসস্ট্যান্ডে নানা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজল রিয়াকে নিয়ে অবস্থান করতে থাকে। ডায়রিয়াসহ নানা রোগে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বড় বোন রিজিয়াসহ অন্য ভাই বোনদের দ্বারস্থ হয় কাজল। রিয়া রোগাক্রান্ত কংকালসার দেহ থেকে শিশুটিকে নিঃসন্তান ভাল পরিবারে দেয়ার জন্য বোন কাজলকে পরামর্শ দেয়। ভাই বোনদের সম্মতিতে রিয়ার ভবিষ্যত্ গড়ে তোলার জন্য ২০১১ সালে জুলাই মাসে ভাই বোনদের উপস্থিতিতে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার নিঃসন্তান কোহিনুর বেগমের কাছে লালন-পালন করার জন্য দেন কাজল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে শিশু রিয়া হয়ে যায় স্বাস্থ্যবান ফুটফুটে। রিয়া তার পালক মা কোহিনুরকে এমনভাবে গ্রহণ করেছে যার কাছে গর্ভধারিণী মা কাজলও হার মেনে গেছে। কোহিনুরও মেয়ের মমতায় লালন-পালন করতে থাকে রিয়াকে। কোহিনুরের দুর্বলতার সুযোগ নেয় কাজলের স্বামী। শাহ সুলতান স্ত্রী কাজলকে নানা কৌশলে বশ করে বনানী বেলতলী বস্তিতে একসঙ্গে বসবাস শুরু করে। মোটা অংকের টাকা আদায়ের জন্য কোহিনুর বেগমের কাছ থেকে শিশু রিয়াকে ছিনিয়ে নেয়ার নানা কৌশল শুরু করে। অপরাধ চক্রের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে সুলতান নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকে। অন্যত্র নিঃসন্তান দম্পতির থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মেয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে সুলতান। এ কাজে বিরোধিতা করে কাজলের ভাই-বোন। সুলতান তাদেরকে নানা ধরনের হুমকি দেয়। গত রবিবার স্বামীর শারীরিক নির্যাতনে কাজল আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য যায়। পরে ঐ দিন বনানী থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে একটি এজাহার দায়ের করেন। মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, শিশুটির লালন-পালন ও পরিচর্যার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জন্মসূত্রে মা না হলেও শিশুটি যাকে গভীরভাবে গ্রহণ করেছে, যাকে সে নিরাপদ মনে করছে তার থেকে শিশুটিকে সরালে সে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মা ছিন্নমূল এবং বাবা মাদকাসক্ত হলে সন্তানের জীবনে নেমে আসবে চরম পরিণতি।