দুই প্রস্তাবের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫৩
নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। তারা মনে করেন, প্রধান বিরোধী দলের প্রস্তাবে বিদ্যমান সংকট আরো ঘনীভূত হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবের মধ্যে অনেক বেশি দূরত্ব ও ব্যবধান রয়েছে। তবে দেশের স্বার্থে সরকার ও প্রধান বিরোধীদলসহ সকল রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় বসলে সমস্যা সমাধানের পথ নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে। এ আলোচনায় বসতে যত দেরি হবে সমঝোতার পথ তত ক্ষীণ হয়ে আসবে। দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসতে হবে :ব্যারিস্টার রফিক প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক এটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাব অনেকটাই সুনির্দিষ্ট। কিন্তু সুনির্দিষ্ট হলে কি হবে এটা বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা দুই নেত্রীকে চিনি। নির্বাচন কালীন সরকার নিয়ে যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তা সমাধানে দু’জনকেই একসঙ্গে বসতে হবে। এটি যদি করা না হয় তাহলে দেশে সংঘাত হবে। ব্যারিস্টার রফিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারের কথা বলেছেন। কিন্তু কাদেরকে নিয়ে ঐ সরকার গঠিত হবে এবং কতজন মন্ত্রী হবেন তা স্পষ্ট করেননি। সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সে বিষয়টি খোলাসা করেননি। কিন্তু তার দলের নেতারা বিভিন্ন বক্তব্যে বিষয়টি খোলাসা করেছেন। এদিকে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়া সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন সম্মানিত নাগরিককে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের কথাও বলেছেন। কিন্তু ওই দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যারা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা সবাই ছিলেন অনির্বাচিত। কিন্তু সংবিধানে তো অনির্বাচিত সরকারের কোন বিধান নেই। তাই এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন করতে হলে দুই দলকে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। তিনি বলেন, আমার মনে হয় দেশে নির্বাচন হবে। বিএনপি হয়ত মানসিকভাবে নির্বাচন করতে প্রস্তুত রয়েছে। শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকলে হয়ত বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। কিন্তু বিএনপিকে বাদ দিয়ে যদি নির্বাচন হয় এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেই সরকার গঠিত হবে তার স্থায়ীত্ব কত দিনের হবে সেটাই দেখার বিষয়? আন্তরিক হলে সমঝোতা হতে পারে :আকবর আলি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রীর পৃথক দুই প্রস্তাবের মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশি। ফলে পরস্পর বিরোধী প্রস্তাব নিয়ে তারা সমঝোতায় আসতে পারবে বলে মনে হয় না। বিদ্যমান সংকট আরো ঘনীভূত হবে। তবে উভয়পক্ষ আন্তরিক হলে যেকোনো প্রস্তাব নিয়েই আলোচনা করা যেতে পারে। এতে ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হবে। সমঝোতার পথ তৈরি হবে। আলোচনার কোন বিকল্প নেই :এম হাফিজ উদ্দিন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছেন এটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। তার ভিত্তিতেই এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে তার এ প্রস্তাব দেশের মানুষের জনমতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, যেকোন সংকট নিরসনে আলোচনা হতে হবে। আলোচনার কোন বিকল্প নেই। সংকট আরো ঘনীভূত হলো :শাহদীন মালিক নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে বিদ্যমান সংকট আরো ঘনীভূত এবং দুই দলের মধ্যে সমঝোতার পথ আরো দূরীভূত হলো বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। শাহদীন মালিক বলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা বিষয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে রাজনৈতিক সংকট আরো গভীর হলো। তার প্রস্তাবে কোনো সমাধান আসলো না। কেননা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের নিয়ে এখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। আওয়ামী লীগ বর্তমান অবস্থায় সংবিধান সংশোধনে যাবে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবের মধ্যে কোনো কমন বা সাধারণ বিষয় নেই বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী। তিনি বলেন, দুই নেত্রীর অবস্থানে ফারাক বা দূরত্ব এত বেশি যে, সমঝোতার সম্ভাবনা আরো দূরীভূত হলো। কেননা সংবিধান সংশোধন ছাড়া বিএনপির প্রস্তাব কার্যকর করা সম্ভব না। আর আওয়ামী লীগ তা করবে বলে আমরা এ মুহূর্তে আশা করতে পারি না। তাই সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণতরই হলো। খালেদা জিয়ার বক্তব্য সম্পর্কে শাহদীন মালিক বলেন, তার বক্তব্যে অতীত রাজনীতির ভুল স্বীকার রয়েছে। ব্যক্তিগত রেশারেশি বিষয়ে তার বক্তব্যে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। কেননা দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত রেশারেশির কারণে তাদের প্রতি জনগণ অনেকটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এক্ষেত্রে তার বক্তব্য ইতিবাচক অর্থ প্রকাশ করে।