দেশ একটি উত্তে-জনার মধ্যে আছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও অন্যান্য রাজ-নৈতিক দলের নেতারা এবং সিভিল সোসাইটির বিশিষ্ট নাগরিকরা গত দু’বছর ধরে ক্রমাগত বলে আসছেন, দেশ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। তারা বলছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু লোকের প্রাণ যাবে। এই অবস্থায় নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে যেসব বক্তব্য প্রকাশ করছেন সেগুলো সারাদেশের সাধারণ মানুষ উত্কণ্ঠার সঙ্গে লক্ষ্য করছেন। প্রধানমন্ত্রী যে ভাষণ দিয়েছেন, তাতে নির্বাচন নিয়ে সমস্যা সমাধানের কোন স্পষ্ট বক্তব্য নেই। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান রবিবার যে ভোজসভায় বসেছিলেন তাতে যে আলোচনা হয় সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বক্তব্য এবং জাতীয় পার্টির বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা সত্য বলছেন ? তারা মিথ্যা বলছেন ? (সোমবার বিকালে) একটু আগে বিরোধী দলের নেতা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তার দলকে সরকারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের আরো কয়েকজন নেতা গত তিন বছর ধরে বিএনপির নেত্রী, তার পরিবার এবং বিএনপির শাসনকাল সম্পর্কে ক্রমাগত অত্যন্ত কুিসত ভাষায় যে প্রচার চালিয়ে আসছেন বেগম খালেদা জিয়া সহজ, সরল ও শোভনভাবে তার জবাব দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি যে কদর্য দশায় পড়েছে তা থেকে রাজনীতিকে উদ্ধার করার কথা বলেছেন। তিনি হিংসা-প্রতিহিংসা ত্যাগ করে রাজনীতিকে স্বাভাবিক গতি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি রাজনীতির মান উন্নত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রকে সকলের জন্য কল্যাণকর রূপ দেয়ার কথা। এগুলো অবশ্যই খুব ভালো কথা। এসব প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়িত করার জন্য যে রকম রাজনৈতিক দল দরকার বিএনপি কি সেরকম দল? অবশ্য বেগম খালেদা জিয়া সারাদেশের গুণবান ব্যক্তিদেরকে আগামী সরকারে সম্পৃক্ত করার কথা বলেছেন যদি তারা ক্ষমতায় যেতে পারেন। ৪০ মিনিটের বেশি সময় ধরে প্রদত্ত তার ভাষণে অনেক কথা তিনি বলেছেন। তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কথা তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন। বাংলাদেশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দিয়ে বিভক্ত করে রাখলে জাতীয় ঐক্য কিভাবে সম্ভব হবে?
বেগম খালেদা জিয়া মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসহ সকলের প্রতি সরকারের দায়িত্বের কথা বলেছেন। বিএনপির উপর গত পাঁচ বছর ধরে সরকারি নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বর্তমান সরকারের দুর্নীতি ও অপব্যবস্থার বিবরণ দিয়েছেন। এসব কথার আবেদন আছে। এগুলো সমাধান করার জন্য যে সরকার দরকার তার পটভূমিতে দরকার উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দল সম্পর্কে বেগম খালেদা জিয়া কিছুই বলেননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্য গণতান্ত্রিক সরকার দরকার। সবশেষে সংক্ষেপে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীকে আহবান জানিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা প্রদান করেছেন। এতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনকালীন উপদেষ্টা পরিষদ হবে ১১ সদস্যের। ১৯৯৬ সালের ও ২০০১ সালের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত ৫ জন এবং বিএনপির মনোনীত ৫ জন সদস্য থাকবেন। আর প্রধান উপদেষ্টা থাকবেন সকল দলের দ্বারা মনোনীত একজন সম্মানিত নাগরিক। আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তার সঙ্গে তুলনায় বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার প্রস্তাব অনেক বাস্তবসম্মত ও সুস্পষ্ট। তবে বিরোধী দলের নেতার প্রস্তাব গ্রহণ করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি রুগ্ন বিকারপ্রাপ্ত, এখানে বাংলাদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন নানা দেশের দৃষ্টান্ত টেনে সেই অনুযায়ী কাজ করতে চাইলে সফল হওয়া যাবে না। আদর্শ রাজনীতির বিষয়ে অনেক কথা বাংলাদেশের কোন কোন বিদ্যজন বই লিখে প্রকাশ করছেন। কেবল বিদেশের দৃষ্টান্ত খোঁজ না করে দলীয় সংকীর্ণতা থেকে মনকে মুক্ত করে দেশের চিন্তাবিদদের লেখার মধ্যে উন্নত রাজনীতির উপায় সন্ধান করলে সেটা ভালো হবে। আমি সিভিল সোসাইটিসমূহের রাজনৈতিক ভূমিকাকে কল্যাণকর মনে করি না, তবু বাস্তবতাকে স্বীকার করতে আমার কুণ্ঠা নেই। বেগম খালেদা জিয়া যাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন উপদেষ্টা পরিষদ করার জন্য প্রস্তাব করেছেন তারা অধিকাংশই হয়তো বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির সদস্য। যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমস্যার সমাধানে অগ্রসর হতে চায়, তাহলে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার প্রস্তাবের চাইতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাব অবলম্বন করে সমাধানের উপায় সন্ধান করা বেশি উপযোগী হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলেরই রাজনীতিক চরিত্র উন্নত হোক। অন্যান্য দলও উন্নতি করুক।
(লেখক ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক)
অনুলিখন ঃ সাইদুর রহমান
