বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর অনির্বাচিত কাউকে উপদেষ্টা করা যাবে না। বর্তমান সংবিধানেও তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকার বলে কিছু নেই। সংবিধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের অধীনে সরকার পরিচালনার নির্দেশনা রয়েছে। অর্থাত্ সরকার পরিচালিত হবে একটি দলীয় অথবা জোট সরকারের অধীনে।
আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া এ প্রস্তাব কার্যকর সম্ভব নয়। এটি কার্যকর করতে হলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান সংবিধানে সংযুক্ত করা যেতে পারে। ওই উপদেষ্টা নিয়োগের পর বর্তমান মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করবেন এবং তার স্থলে উপদেষ্টারা দায়িত্ব পালন করবেন এমন বিধান সংযুক্ত করতে হবে।
গতকাল সোমবার বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে ও ২০০১ সালে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়া সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিকে একজন সম্মানিত নাগরিককে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের কথা রয়েছে তার প্রস্তাবে। বেগম জিয়া বলেছেন, সংসদ যেভাবে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করে থাকে সেভাবেই এই ১০ উপদেষ্টাকে নির্বাচিত করা যেতে পারে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বর্তমান সংবিধান যে রূপ ধারণ করেছে তাতে সংবিধান সংশোধন ছাড়া কোনভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সম্ভব নয়।
সংবিধানের ৫৫ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে।’ ৫৬ অনুচ্ছেদের ২ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে তাহার সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।’
একই অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।’ এছাড়া ৫৬ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যাহতি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের ২ (প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী নিয়োগ সংক্রান্ত ) বা ৩ উপ-অনুচ্ছেদের অধীনে (প্রধানমন্ত্রী) নিয়োগদানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার অব্যাহতিপূর্বে যাহারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাহারা সদস্য রূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’ সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে যদি (ক) তিনি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন; অথবা (খ) তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন।’
সংবিধানের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ অনুচ্ছেদ একত্রে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় যে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে মন্ত্রীসভা আছে, যদি না তারা পদত্যাগ করেন তাহলে তাদের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদি কোন কারণে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন বা সংসদের আস্থা হারান তাহলেও নির্দলীয় কোন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে হবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ট সদস্যদের আস্থাভাজন কোন সদস্যকে। সংসদ সদস্য নন এমন কারো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। তবে মন্ত্রিসভায় দশ জনের একজন অনির্বাচিত ব্যক্তি হতে পারেন। বর্তমান সংবিধানে উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টা বলে কোন পদ নেই।
এছাড়া ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের সংক্ষিপ্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আগামী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার বিষয়ে অভিমত দিয়েছিলো। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাকে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধুমাত্র জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ দ্বারা গঠিত হইতে পারে, কারণ, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র, প্রজাতান্ত্রিকতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং এই রায়ে উক্ত বিষয়গুলোর উপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। ’
এদিকে বেগম জিয়া রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যরা যেভাবে নির্বাচিত হন, সেভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের নির্বাচন জাতীয় সংসদ করে থাকে। অন্যদিকে সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচন হয় সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে। এখন সংসদ সদস্যদের ভোটে উপদেষ্টা নিয়োগ করতে হলে সংবিধানে একটি সংশোধনী লাগবে। বেগম জিয়ার প্রস্তাবে আওয়ামী লীগ যদি সম্মত হয় তবেই এই বিধান সংবিধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু ১৯৯২ সালে একাদশ ও দ্বাদশ সংবিধান সংশোধন বিল ছাড়া আর কোন বিলেই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ঐকমত্য হয়নি।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা কেউ কেউ মনে করেন, দু’দল আন্তরিক হলে সংবিধান সংশোধন ছাড়াও দশজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে দশজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করিয়ে তাদের আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপদেষ্টা নির্বাচিত করে আনা যায়। এছাড়া ১৯৯৬ সালের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন বিধান সংবিধানে ছিলো না। দেশের প্রয়োজনে এ বিধান সংযুক্ত করতে হয়েছিলো। এখন দু’দল চাইলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান সংযুক্ত করা যেতে পারে।
