বাংলা প্রথমপত্র
সৃজনশীল বুদ্ধিকে করে জাগ্রত মেধাকে করে শাণিত
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন
সিনিয়র শিক্ষক : বাংলা
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মাদ পাবলিক কলেজ ঢাকা
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের মেলে ধরতে সৃজনশীল মেধার প্রসার ছাড়া কোনো উপায় নেই। বিশ্বের উন্নত জাতির সাথে আমরা নিত্য এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের সৃজনশীল কাজের গুণগত মান ধরেই। প্রতিনিয়ত সে ভাবনাকে তারা রূপ দিচ্ছে নতুন আবিষ্কারে। তোমরা জানো ভয়—ভীতি বা কোনো কিছু মুখস্ত করে বা অনুকরণ করে ভালো কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। শিক্ষা হলো সকল ভাবনার মূল উত্স। মানুষ শিখে শিখে বিশাল বিশাল সৃষ্টি করে। মুখস্ত করা বিদ্যা সব সময়-ই মানুষকে অনুকরণ প্রিয় বা নকলবাজ করে তোলে; সে শিক্ষা এক প্রকার ধোঁকাবাজ। আমি যখন শিক্ষার্থীদের পড়াই—তাদেরকে আমি জীবনের গল্প শোনাই; স্বপ্নের দ্বারস্থ করি তাদেরকে। তোমরা এখন ছোটো। তোমরা দেখো, শেখো, ভাবো। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে তোমরা নিজের ভাবনাকে যত পারো প্রাধান্য দাও; অপরে কী লিখলো, কী বললো তা মুখ্য করো না; নিজে ভাবতে শেখো, সৃজনশীল প্রতিভায় তুমি বিকশিত হবেই।
‘সৃজনশীল’ একটি উন্নতমানের শেখার কৌশলগত পদ্ধতি। শুধু নিজের ভাবনাকে অতিশয় ভাবালে সৃজনশীল ভয়ের কিছু থাকে না। মানুষ পারে না এমন কোনো অসাধ্য আজও সৃষ্টি হয়নি বলে অনেকেই মনে করে; কেনো তোমরা তা জানো? আসলে মানুষ তার বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনা দিয়ে অসাধ্য সাধন করে। সৃজনশীল পদ্ধতিও বুদ্ধিগত ভাবনা; সৃজনশীল ভীতি বলে তোমার শিক্ষা জীবনে আর কিছুই থাকবে না যদি তুমি ভাবতে পারো নতুন করে।
বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতিতে পাঠ্য বই পাঠের বিকল্প নেই; আবার পাঠ্য বই জানার ও বোঝার জন্যে তাকে অন্য বই বা পরিবেশের আর দশটি জিনিসের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হয়। তোমাদের ভাবনা অতি উন্নত। তোমরা হয়তো জানো না বিশ্বে আমাদের শিশুদের মনোবল প্রশংসনীয়। পৃথিবীর বড় বড় আয়োজনে আমরা বার বার জিতে আসছি অনেক বড় দেশকে পরাজিত করে। সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় আমাদের ভাবনাগুলো অত্যন্ত তীক্ষ এবং বৃদ্ধিদীপ্ত। তোমরা আধুনিক শিক্ষাধারার কর্ণধার। সৃজনশীল পদ্ধতি আজ ও আগামীকে নতুন মাত্রায় জয় করিয়ে তোমাদেরকে বিশ্বের বুকে নতুনভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন আবশ্যক। জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে নতুনভাবে না ভাবলে কখনই পরিবর্তিত হওয়া যাবে না। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও ধারণার পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি বিধানের জন্যে শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন করা হয়েছে। আধুনিক জীবনের সৃষ্টিশীল ধারা থেকেই আরম্ভ হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি। সৃজনপ্রয়াসী চিন্তা-চেতনা বিকাশের অনিবার্যতা থেকেই শিক্ষাক্রমের এই পরিবর্তন। বর্তমানে শিক্ষকেরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তোমরা তাঁদের সান্নিধ্যে যেতে পারছো। নতুন ভাবনাকে নানামুখী ভাবতে পারছো তাই সৃজনশীল বিকাশে তোমাদের কোনো ভয় থাকবে না আশা করি।
চলো আমরা জেনে নিই সৃজনশীল কী?
সৃৃজনশীল হলো একটি কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপদ্ধতি প্রক্রিয়া অর্থাত্ পূর্বের কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপদ্ধতির নাম করা হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি। এখানে মুখস্ত বিদ্যার দৌরাত্ম্য নেই বলে এখানে একজন শিক্ষার্থী নতুন করে ভাবতে পারে। সৃজনশীল ধারায় সর্বোচ্চ ৩০ভাগ নম্বর মুখস্ত করে লেখা যাবে। বাকী অংশগুলো অবশ্যই তাকে নিজের ভাষায় লিখতে হবে। সৃজনশীল ধারায় একজন শিক্ষার্থীকে পাঠ্য বইয়ের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে গেলে বিষয়বস্তু সম্পর্কে পুরো ধারণা রাখা আবশ্যক। জ্ঞান স্তরের প্রশ্ন একজন শিক্ষার্থী মুখস্ত করে সরাসরি উত্তর লিখতে পারবে কিন্তু অনুধাবন স্তরের উত্তরে তাকে ভাবতে হবে এবং বুঝিয়ে উত্তর করার প্রবণতা থাকতে হবে। গ এবং ঘ এর উত্তরে অবশ্যই উদ্দীপক এবং মূল গল্পের সম্পর্ক নির্ধারণ করা আবশ্যক। উত্তরের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় খ, গ, ঘ এর উত্তরে শিক্ষার্থীরা প্রশ্নে চাওয়া মূল উত্তরটুকু ধরতে পারে না; যার ফলে তারা সেখানে পুরো নাম্বার পাচ্ছে না। খ, গ, ঘ এইসব প্রশ্নের উত্তরে একজন শিক্ষার্থীকে নিজের মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে উত্তরের মূল অংশ বের করে তবেই আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতে হবে। নিচে আমরা এই সম্পর্কিত একটি উদ্দীপক দেখি এবং বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিই : (উদ্দীপক জেএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্রের অতিথির স্মৃতি থেকে নেয়া)
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর :
উদ্দীপকটি খেয়াল করো : কমপক্ষে দুইবার পড়ো
শেরপুরের নাইমুদ্দিন প্রায় ১০ বছর ধরে তার পোষা হাতি কালাপাহাড়কে দিয়ে লাকড়ি টানা, চাষ করা, সার্কাস দেখানো ইত্যাদি কাজ করে আসছিলো। কিন্তু বর্তমানে দারিদ্র্যের কারণে হাতির খোরাক যোগাড় করতে না পেরে একদিন সে কালা পাহাড়কে বিক্রি করে দিল। ক্রেতা কালাপাহাড়কে নিতে এসে ওর পায়ে বাধা রশি ধরে টানাটানি করে একচুলও নাড়াতে পারল না। কালাপাহাড়ের দু’চোখ বেয়ে শুধু টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। পরের দিন খদ্দের আরও বেশি লোকজন সাথে করে এসে কালাপাহাড়কে নিয়ে যাবে বলে চলে যায়। কিন্তু ভোরবেলা নাইমুদ্দিন দেখে—কালাপাহাড় মরে পড়ে আছে। হাউমাউ করে সে চিত্কার করে আর বলে—‘ওরে আমার কালাপাহাড়, অভিমান করে তুই চলে গেলি।’
ক) শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন পদক লাভ করেন? (জ্ঞান)
খ) লেখক দেওঘর থেকে বিদায় নিতে নানা অজুহাতে দিন দুই দেরি করল কেন? (অনুধাবন)
গ) কালাপাহাড়ের আচরণে ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের যে দিকটি প্রকাশ পেয়েছে তার বর্ণনা দাও।(প্রয়োগ)
ঘ) উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের অনুভূতি আর ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের লেখকের অনুভূতি একই ধারাই উত্সারিত বলে তুমি মনে কর কি? তোমার মতের পক্ষে যুক্তি দাও।(উচ্চতর দক্ষতা)
উত্তর : ক
শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘জগত্তারিণী পদক’ লাভ করেন। (সরাসরি বই থেকে লেখা হয়েছে ‘জগত্তারিণী পদক’ শব্দটি)
উত্তর : খ
লেখক অতিথির সাথে অর্থাত্ কুকুরটির প্রতি ভালোবাসাস্বরূপ তার সময় কাটানোর জন্যে নানা অজুহাতে দিন দুই দেরি করলো। (প্রশ্নে চাওয়া মূল উত্তর)
সুস্থ হওয়ার জন্যেই লেখক দেওঘরে গিয়েছিলেন। নানান পরিবেশের ফাঁকে লেখকের সাথে একটি কুকুরের সখ্যতা গড়ে ওঠে; কুকুরটিও বন্ধুসুলভ হয়ে ওঠে লেখকের কাছে। এই মমত্ববোধ ছেড়ে একদিন লেখককে বিদায় নিতে হচ্ছিলো। কিন্তু রোগের দোহায় দিয়ে লেখক কুকুরটির প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করে যার ফলে তিনি আরও দিন দুই সেখানে দেরি করলেন।
(প্রশ্নে চাওয়া মূল উত্তর ব্যাখা করা হয়েছে)
উত্তর : গ
কালাপাহাড়ের আচরণের সাথে ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের মানুষের প্রতি পশুর ভালোবাসার স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে। (অংশ : ১ প্রশ্নে চাওয়া মূল উত্তর)
উদ্দীপকের কালাপাহাড় একটি পশু যার আচরণ তার মানুষের সাথে পশুর সুগভীর সম্পর্ককে নির্দেশ করে। মালিকের প্রতি ভালোবাসা স্বরূপ এই পশুটি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত লড়াই করে গেছে তার মনিবের কাছে থাকার জন্যে। দারিদ্র্যের শিকার মালিক নাইমুদ্দিন চাইলেও তাকে বিক্রি হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি কিন্তু কালাপাহাড় তা না মেনে অন্যের হাতে যাওয়ার আগেই মারা গেছে। এই আচরণ ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের কুকুরের সাথে সম্পর্কিত।(অংশ : ২ মূল উত্তরের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে)
‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পে দেখা যায়, লেখক দেওঘরে গিয়ে কুকুরের সাথে যে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাতে উভয়ের মাঝে তৈরি হয় এক গভীর ভাবের সম্মিলন। কুকুরটি লেখকের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে কিন্তু অপর কাউকে দেখলে সে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। দেওঘরে লেখকের সাথে আত্মিকভাবে গড়ে ওঠে কুকুরটির কিন্তু একদিন লেখকের চলে যাওয়ার ডাক আসে। তাই সব ফেলে লেখক গাড়িতে উঠলে কুকুরটি করুণদৃষ্টি তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। উদ্দীপকের কালাপাহাড়ও কুকুরটির মতো অসহায় ভালোবাসার নমুনা প্রকাশ করে। উভয় প্রাণীর মধ্যেই মানুষের প্রতি ভালোবাসার বিনম্র মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে।(অংশ : ৩ সম্পৃক্ত অংশ উদ্দীপক ও গল্পের আওতায় এনে নিবিড় সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে; উদ্দীপক ও গল্পের মেলবন্ধন ‘গ’ অংশে শুরু হয়)
উত্তর : ঘ উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের অনুভূতি আর ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের লেখকের অনুভূতি পশুপাখির প্রতি মমত্বের দিক থেকে একই ধারাই উত্সারিত বলে আমি মনে করি।
(অংশ : ১ প্রশ্নে চাওয়া মূল উত্তর)
উদ্দীপকে নাইমুদ্দিনের মধ্যে আমরা পশুপ্রেম নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করি। অতি দারিদ্র্যতার জন্যে সে তার পোষা কালাপাহাড় নামক হাতিকে বিক্রি করে দিলেও পোষা হাতি তার কাছ থেকে দূরে যায়নি। বরং শেষ পর্যন্ত হাতিটি মনিবের প্রতি ভালোবাসাময় অভিমান করে মৃত্যুকে অনায়সেই গ্রহণ করেছে। হাতির মৃত্যুতে সাথে সাথে নাইমুদ্দিনের যে আত্মবিলাপ তা যেনো অতিথির স্মৃতি গল্পে লেখকের অতিথির হারানোর বেদনার প্রতিরূপ। (অংশ : ২ মূল উত্তরের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে)
অতিথির স্মৃতি’ গল্পের পটেও আমরা উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের মতো একপ্রকার গভীর বেদনাবোধ লক্ষ্য করি। কেননা লেখক যখন দেউঘরে বায়ু পরিবর্তনের জন্যে গিয়েছিলেন তখন তার সাথে একটি কুকুরের সখ্য ভাব গড়ে ওঠে। কুকুরটি যেনো লেখকের কাছে আত্মীয় হয়ে ওঠে; তার প্রতি লেখকের ভালোবাসা যেনো তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ দিকে কুকুরটিকে একা ফেলে আসাতে লেখকের মনেও উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের মতো বেদনাবোধ আমরা দেখতে পাই। (অংশ : ৩ সম্পৃক্ত অংশ উদ্দীপক ও গল্পের আওতায় এনে নিবিড় সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে)
পশুর প্রতি ভালোবাসা বা মমত্ববোধ মানুষের চিরকালীন। উদ্দীপক এবং মূল গল্পে যে বোধ আমাদেরকে পশুর প্রতি মমত্ববোধ শেখায় তা যেনো আমাদের চিরচেনা একটি দৃশ্য। উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের পোষা হাতি কালাপাহাড়কে হারিয়ে যে অনুশোচনা তা লেখকেরই অনুশোচনার প্রতিরূপ কেননা নাইমুদ্দিন অভাবের তাড়নায় হাতি বিক্রি করলে শেষে সে পোষা প্রাণীর মমতা বুঝতে পেরেছে এবং সে ব্যথায় সে ব্যথিত হয়েছে। লেখকও অতিথির প্রতি যে ভালোবাসা বা মমত্ব দেখিয়েছেন কিন্তু শেষে যখন তিনি চলে আসবেন বলে মনে ভাবলেন তখনই আমরা দেখি অতিথির প্রতি তাঁর মনের মধ্যে এক অজানা মমতা। শেষে লেখকের চলে আসার মুহূর্তটি আমাদের নাইমুদ্দিনের মনের অবস্থার সাথে মিলিয়ে দেয় লেখক ও সমগ্র গাল্পিক পরিবেশকে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের অনুভূতি আর ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের লেখকের অনুভূতি একই ধারাই উত্সারিত। (অংশ : ৪ এ অংশে উদ্দীপক, গল্পের বাস্তবতা এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে)
