‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৩৯
বিশেষ কোন ঝামেলায় না পড়লে সোয়াত থেকে কেউ ইসলামাবাদ যায় না। আরো অনেকের মত আমার আম্মু সোয়াতের বাইরে কখনো যায়নি। মিঙ্গোরা হল এই উপত্যকার সবচেয়ে বড় শহর, বলা যায় একমাত্র শহর। আমরা এই শহরেই বাস করি। শহরটি বেশ ছোট। তবে আশপাশ গ্রামের লোকজন এসে এই শহরকে নোংরা ও ঘিঞ্জি করে ফেলছে। এখানে বেশ কিছু হোটেল, কলেজ, একটি গলফ কোর্স এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, রত্ন-পাথর কেনা-বেচার জন্য একটা বড় বাজার আছে। অবশ্য দরকারি সবকিছুই মেলে এ বাজারে। বাজারের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট এক স্রোতস্বিনী—নাম মর্গাহজর। শপিং ব্যাগ, পলিথিন, প্ল¬াস্টিকের নানা জিনিসপত্র ফেলে ভয়ানক নোংরা করে তোলা হয়েছে সেটাকে। শহরের বাইরে পাহাড়ি নদীগুলোর পানি কি স্বচ্ছ, কি পরিষ্কার! সেখানে লোকজন সুস্বাদু ট্রাউট মাছ ধরে এবং সেগুলোর তীরে বহু লোক ছুটি কাটাতে আসে। আমাদের বাড়িটা গুলকাদা এলাকায়। গুলকাদা কথাটার মানে হল ফুলে ছাওয়া এলাকা। তবে অনেকে এই জায়গাটাকে বলে বুটকারা। এই কথাটার অর্থ বুদ্ধমূর্তির এলাকা। আমাদের বাড়ির কাছেই বেশ বড় এক খোলা প্রান্তর। যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রহস্যময় বহু ধ্বংসাবশেষ। ভাঙ্গা সিংহ মূর্তি, ভাঙ্গা স্তম্ভ, মস্তকবিহীন মানবমূর্তি। সবচেয়ে রহস্যময় হল পাথরের তৈরি শত শত ছাতা। আমাদের এই উপত্যকায় প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে একাদশ শতাব্দীতে, গজনির সুলতান মাহমুদ এই এলাকা অধিকার করার পর। আফগানিস্তান থেকে এসে তিনি এই এলাকা অধিকার করে তার শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তার আগে সোয়াত ছিল বৌদ্ধ রাজ্য। বৌদ্ধরা এখানে আসে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে এবং তারা টানা ৫শ’ বছর রাজত্ব করে এখানে। চীনা অভিযাত্রীদের লেখা থেকে জানা যায়, সোয়াত নদীর দুই তীরে ১৪শ’ বৌদ্ধ মন্দির ছিল সে আমলে এবং এসব মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনিতে মুখরিত হত সমগ্র উপত্যকা। এসব মন্দির অনেক আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে; তবে আপনি সোয়াতের যে এলাকাতেই যান না কেন, রাশি রাশি প্রিমরোজ এবং অন্যসব বনফুলের মাঝে আপনি সেসব মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। আমরা চড়ুইভাতি করতে যেখানেই যেতাম, সেখানেই দেখতাম, পদ্মের ওপর পদ্মাসনে আসীন সহাস্য বুদ্ধমূর্তি। গৌতম বুদ্ধ সয়ং এখানে এসেছিলেন বলে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। শোনা যায়, তার দেহভস্মও রয়েছে এখানকার এক মহাস্তূপের নিচে। আমাদের বুটকারা ধ্বংসাবশেষও একটা অসাধারণ স্থান। লুকোচুরি খেলতে এর জুড়ি নেই। একবার বেশ কয়েকজন বিদেশি প্রত্নতাত্ত্বিক এসেছিলেন এখানে। অনেক অনুসন্ধানের পর তারা আমাদের বলেছিলেন, এটা বৌদ্ধ তীর্থস্থান ছিল এক সময়। এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর বৌদ্ধ মন্দির ছিল, বহু মন্দিরের চূড়া ছিল স্বর্ণ নির্মিত। সে আমলে বৌদ্ধ রাজাদের সমাধিস্থ করা হত এখানে। আমার আব্বু ‘বুটকারায় বুদ্ধের দেহাবশেষ’ নামে একটা কবিতাও লিখে ছিলেন। এক সময় এখানে মন্দির আর মসজিদ কত সুন্দরভাবে পাশাপাশি অবস্থান করত—সে কথাই তিনি বলার চেষ্টা করেছেন সেই কবিতায়: মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসত ধ্বনি আযানের, সত্যের আহ্বান, সুন্দরের আহ্বান আহ্বান মঙ্গলের। তা শুনে আনন্দে হাসতেন বুদ্ধ মন্দিরে বসে তার ইতিহাসের ছেঁড়া মালা জুড়ে যেত আবার!