হিন্দুকুশ পর্বতমালার পাদদেশে আমাদের বাস। লোকে সেই পর্বতে যেত পাহাড়ি ছাগল আর সোনালি বন মোরগ শিকারে। আমাদের বাড়িটি একতলা এবং মজবুত। বিশাল ছাদ। সেটা ছিল আমাদের ‘খেলার মাঠ’। স্বচ্ছন্দে ক্রিকেট খেলাও চলত সেখানে। সন্ধ্যায় আমার আব্বু প্রায়ই তার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সেখানে বসে চা খেতেন। মাঝে মাঝে আমি গিয়েও সেই ছাদে বসতাম। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম চারপাশের বাড়িঘর থেকে রান্নাবান্নার ধোঁয়া উড়ছে। সন্ধ্যা নামার পর ভেসে আসত ঝিঁঝি পোকার ডাক।
আমাদের উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা ফলমূলের গাছ। গাছে গাছে ধরে আছে ডালিম, পিচ, মিষ্টি ডুমুর। আমাদের বাগানে আঙুর ধরে অনেক। এছাড়া সে বাগানে পেয়ারা, খেজুর তো আছেই। আমাদের বাড়ির উঠোনে একটা বড় তালগাছ। খুব মিষ্টি তাল হয় তাতে। এসব ফল খাওয়ার জন্য পাখিদের সঙ্গে আমাদের রীতিমত প্রতিযোগিতা চলে। প্রচুর পাখি থাকে এসব গাছপালায়। কাঠঠোকরাও আছে। আমাদের ঘরের পেছন দিকে একটা বারান্দা আছে। সেখানে প্রায়ই বাড়ির মহিলারা এসে বসতেন। আম্মু সেখানে দাঁড়িয়ে পাখিদের সঙ্গে কথা বলতেন। আমার মনে আছে, আমাদের যতটুকু খাবার দরকার, আম্মু তারচেয়ে কিছু বেশি রান্না করতেন। এই বাড়তি খাবারটা তিনি গরিবদের ডেকে খাওয়াতেন। তারপরও যে খাবারটা থেকে যেত বা পড়ে থাকত, সেটা আম্মু এসব পাখিকে খেতে দিতেন। পশতুনরা ‘তাপেই’ নামে এক রকমের গান গাইতে খুব পছন্দ করে। এসব গান সাধারণত দুই লাইনের বেশি নয়। আম্মু পাখিদের জন্য ভাত ছড়িয়ে দিতে দিতে গাইতেন, ‘একটা ঘুঘুও মেরো না যেন ভুলে/একটা যদি মারো বাকিরা চলে যাবে, ফিরবে না কোন কালে।’
আমাদের ছাদের ওপর বসে বসে দূরের পাহাড় দেখতে আর মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনতে ভারি ভালো লাগত আমার। সেখানে বসে বসে যে দিগন্ত রেখায় যে পাহাড়গুলো আমার দৃষ্টিতে আসত তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল এলুম। খানিকটা পিরামিডের মত দেখতে। পাহাড়টি এত উঁচু যে, প্রায়ই তার মাথায় মেঘের মালা পরানো থাকত। গরমকালেও তার মাথায় তুষারের মুকুট পরানো থাকত। স্কুলে পড়তে পড়তে জানলাম, খ্রিস্টের জন্মের ৩২৭ বছর আগে, এমনকি বৌদ্ধরা সোয়াতে আসার আগে আলেক্সান্ডার দি গ্রেট হাজার হাজার হাতি আর বহু সৈন্যসামন্ত নিয়ে আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়ার সময় এ পথেই গিয়েছিলেন। সোয়াতের বাসিন্দারা তখন প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ে গিয়ে পালিয়ে ছিল। কারণ তারা ভেবেছিল, পাহাড়ের অনেক উঁচুতে উঠে গেলে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তাদের রক্ষা করবেন! কিন্তু আলেক্সান্ডার অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তের এবং ধৈর্যশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কাঠ দিয়ে অনেক উঁচু সিঁড়ি বানালেন যাতে তার ওপর দিয়ে তীর ছুঁড়লে পাহাড়ের অনেক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এরপর তিনি সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন যাতে তিনি তার শক্তির প্রতীক জুপিটার (বৃহস্পতি গ্রহ) তারকা ধরতে পারেন।
আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম ঋতুতে ঋতুতে পাহাড় কিভাবে তার রঙ বদলায়। হেমন্তে হিম শীতল বাতাস। সবই তুষার ধবল হয়ে যায় শীতের সময়। তখন ছাদের চারদিকে ছোরার মত লম্বা লম্বা বরফের ফলা ঝুলতে থাকে। সেগুলো ভেঙ্গে নিয়ে খেলা করতে খুব ভালো লাগত আমাদের। বরফের ওপর ছোটাছুটি করতাম, বরফ জমা করে করে তুষার মানব, তুষার ভল্লুক বানাতাম এবং উড়ন্ত স্নো ফ্লেকস ধরার চেষ্টা করতাম। সোয়াতে বসন্ত কালটা দারুণ, কোন তুলনা হয় না! ইউক্যালিপটাসের ফুল উড়ে উড়ে ঘরের ভেতর পর্যন্ত চলে আসে। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সব। মাঠ থেকে বাতাসে ভেসে আসে পাকা ধানের ম ম করা গন্ধ। আমার জন্ম গ্রীষ্মে। এ কারণেই হয়ত এই ঋতুটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। যদিও গ্রীষ্মে মিঙ্গোরাতে খুব গরম পড়ে, নদীটা প্রায় শুকিয়ে যায় এবং লোকজন সেখানে আবর্জনা ফেলে ফেলে নোংরা করে রাখে।
